২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, দোকানের মালামাল ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়া, মারধর এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. আরমান উদ্দিনসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে।রবিবার (২৩ আগস্ট) চট্টগ্রামের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে লোহাগাড়ার পশ্চিম কলাউজানের বাসিন্দা ও প্রবাসী আমির হোসেন (৫৭) মামলাটি করেন। মামলায় আরমান উদ্দিনসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আরও চার থেকে পাঁচজনকেও আসামি করা হয়েছে।মামলার এজাহারে বলা হয়, আমির হোসেন লোহাগাড়ার আজিজ কমপ্লেক্স এলাকায় চারতলা ভবন নির্মাণ করে নিচতলায় দোকান এবং অন্যান্য অংশে ভাড়াটিয়া রেখেছেন। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর দেশে ফেরার পর কিছুদিন ধরে আরমান উদ্দিনের নেতৃত্বে আসামিরা তাঁর কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন।বাদীর অভিযোগ, আসামিরা তাকে বলেন, এলাকায় বসবাস করতে হলে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হবে। টাকা না দিলে তার মার্কেট ও ভবন দখল করে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩ এপ্রিল রাত ২টার দিকে আসামিরা আমির হোসেনের মার্কেটের নিচতলায় ভাড়াটিয়া ওবায়দুলের দোকানের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে বিভিন্ন ধরনের স্টিলের আলমারি, ওয়াল শোকেস, আলমারির সিটসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়।মামলায় এসব মালামালের আনুমানিক মূল্য ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫৯ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া দোকানের ক্যাশ টেবিলসহ ভেতরে থাকা নগদ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।অভিযোগে আরও বলা হয়, পরে দোকানের ভাঙা অংশে নতুন তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। ভবনের অন্য ভাড়াটিয়াদেরও আসামিদের মাধ্যমে বাসা ভাড়া দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এ সময় আরিফ উদ্দীন বলেন, ২০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে তারা বাদীর দোকান ও ঘরের দখল ছাড়বেন না।আরমান উদ্দিন মোবাইল ফোনে আমির হোসেনকে তাদের কথামতো চলার জন্য চাপ দেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে আরেক আসামি চাঁদা না দিলে আমির হোসেনকে হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। পরে আসামিরা তাকে কিল, ঘুষি ও লাথি মেরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করেন বলে অভিযোগ করেছেন বাদী।আমির হোসেনের দাবি, তিনি লোহাগাড়া থানায় অভিযোগ করলেও মামলা নেওয়া হয়নি। পরে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন। মামলায় আরমান উদ্দিন ছাড়াও মো. আরিফ উদ্দীন (৩৭), শওকত আলী (৪২), মো. আদিল (৩২), মো. আনোয়ার (২৮) ও জয়নাল আবেদীন (৩৩) কে আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩২৩, ৩৮৪, ৩৮৫, ৩৮০ ও ৫০৬(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।এটি আরমান উদ্দিনকে ঘিরে ওঠা প্রথম অভিযোগ নয়। এর আগে ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করে টাকা আদায়, বালু উত্তোলন নিয়ে বিতর্ক, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার নামে খাল খননের ডিও লেটার এবং প্রশাসন-পুলিশের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার কথোপকথন ফাঁসসহ নানা ঘটনায় তার নাম আলোচনায় এসেছে।২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর লোহাগাড়ার ব্যবসায়ী খোরশেদ আলমকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করে টাকা আদায়ের অভিযোগও ওঠে আরমানের বিরুদ্ধে। খোরশেদের অভিযোগ ছিল, তার কাছে ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। পরে মামলা থেকে রেহাই ও লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারের কথা বলে ৮ লাখ টাকায় সমঝোতা হয়। টাকা ও চেক দেওয়ার পরও তাকে তুলে নিয়ে মারধর করে আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।খোরশেদের আরও অভিযোগ ছিল, তাকে মারধর করে চট্টগ্রাম নগরের একটি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আরমান উদ্দিনের সঙ্গে তার দেখা হয় এবং আরও টাকা দেওয়ার জন্য চাপ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আরমান উদ্দিন দাবি করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে।
১ মাস ১৬ দিন আগে
চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও সিডিএ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে শাহীন সুলতানা নামে এক শিক্ষিকা নিয়োগে চরম অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে অভিযোগ উঠেছে সৈয়দা নিলুফা আক্তার নামে আরেক শিক্ষিকার চাকুরি স্থায়ীকরণ নিয়ে। সেই সাথে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য আসছে সামনে। সিডিএর গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও এসব অভিযোগের সত্যতা রয়েছে। তবে এই তদন্ত প্রতিবেদনও ফেল। আর এ নিয়ে এলাকা জুড়ে তোলপাড় চলছে অভিবাবক ও সচেতন মহলের মাঝে। তাদের প্রত্যাশা দুদকের মাধ্যমে এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে। অভিবাবক ও সচেতন মহলের দাবি, আইসিটি বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগকালীন সময়ে কম্পিউটার সায়েন্সে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি এবং ঘঞজঈঅ নিবন্ধনধারী একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও তাঁদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। উল্টো সকল নিয়ম তোয়াক্কা না করে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হতে B.Pharm I M.Pharm ডিগ্রিধারী শাহীন সুলতানাকে। যাঁকে সরাসরি দশম গ্রেডে নিয়োগ প্রদান করা হয়। কম্পিউটার সায়েন্সের ডিগ্রিধারী ও নিবন্ধিত যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে মাত্র ৬ মাসের কম্পিউটার কোর্স থাকা সত্ত্বেও তাঁকে এ পদে আসীন করার নেপথ্যে স্বজনপ্রীতি কাজ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কারণ তিনি ছিলেন তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সচিবের আপন ভাগিনী।প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর থেকেই শুরু হয় নানা প্রশাসনিক অসংগতি। নিজ বিষয় বাদ দিয়ে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণীর বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান বিষয়ে প্রভাব খাটিয়ে রুটিনে ক্লাস অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ফলে মূল আইসিটি বিষয়টিতে শিক্ষকতা করতেন অন্য বিষয়ের অনভিজ্ঞ শিক্ষকরা, আর শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হতো নিয়মিত ল্যাব প্র্যাকটিস থেকে। পরবর্তীতে তৎকালীন প্রশাসন যোগ্যতা অনুযায়ী রুটিন বণ্টন করলে শিক্ষক মিলনায়তনে শুরু হয় হট্টগোল। প্রতিষ্ঠানটির একাধিক শিক্ষকের লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, শুধু সহকর্মীদের সাথে অসদাচরণ ও শিক্ষকদের নিয়ে গ্রুপিং সৃষ্টিই নয়; পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল, রুটিন পরিবর্তন, ক্লাস পার্টির নাস্তার কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দায়িত্ব অবহেলার মতো একের পর এক ঘটনা ঘটিয়েছেন তিনি।এসব ধারাবাহিক অব্যবস্থার রেশ ধরে ২০১৯ সালের ৭ই মার্চ শিক্ষক মিলনায়তনে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে প্রতিষ্ঠানের ৩৪ জন শিক্ষক যৌথভাবে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে তৎকালীন সিডিএ চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় ৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।তদন্ত কমিটির (তদন্তকালীন পদবি) আহ্বায়ক ছিলেন জনাব মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন শাহ্ (তৎকালীন সদস্য, সিডিএ বোর্ড), সদস্য সচিব ছিলেন জনাব কে. বি. এম শাহজাহান (তৎকালীন সদস্য, সিডিএ বোর্ড) সদস্য ছিলেন জনাব ভূপতি ভূষণ ইমরান (তৎকালীন সদস্য, সিডিএ বোর্ড), জনাবা তাহেরা ফেরদৌস বেগম (তৎকালীন সচিব, সিডিএ) এস. এম. এরশাদ হোসেন (সিনিয়র শিক্ষক-গণিত, সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ) সদস্য সচিব জনাব এ. এস. এম হাবিবুর রহমান (তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-২, সিডিএ)অডিও রেকর্ড, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে অভিযোগের সত্যতা পায় তদন্ত কমিটি। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় প্রবিধান ভঙ্গের দায়ে সিডিএ ও বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ তাঁকে চূড়ান্ত বরখাস্ত ও অপসারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু রহস্যজনক ও প্রশাসনিকসহ নানা অজুহাতে সেই বরখাস্তের আদেশ আজও কার্যকর হয়নি। অভিযুক্ত এই শিক্ষিকা এখনো পদে বহাল রয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদনে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এবং এসব বিস্ফোরক অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষিকা শাহীন সুলতানার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। পুরো বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি দাবি করেন, নিয়োগের সময় আমার কাছে যেসব কাগজপত্র চাওয়া হয়েছিল, আমি সবই জমা দিয়েছি। শিক্ষকদের অভিযোগ সংক্রান্ত কোনো ঘটনার কথা আমার মনে নেই, আমি সবকিছু ভুলে গেছি। অন্যদিকে একই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই এক সহকারী শিক্ষকের চাকরি স্থায়ীকরণের অভিযোগ উঠেছে। নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৬ সালের ১৬ এপৃল অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় শিক্ষকদের স্থায়ীকরণ সংক্রান্ত যে রেজুলেশন গৃহীত হয়, সেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের সহকারী শিক্ষক সৈয়দা নিলুফা আক্তারের নাম ছিল না। অথচ একই বছরের ৪ আগস্ট তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নুরুল আলম স্বাক্ষরিত স্থায়ীকরণ পত্রে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বর্তমানে তিনি স্থায়ী শিক্ষক হিসেবে ১০ম গ্রেডে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন।রেকর্ডপত্র অনুযায়ী, উক্ত পদে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ও রেজুলেশন ব্যতিরেকে কীভাবে এ স্থায়ীকরণ পত্র জারি করা হলো-তা নিয়ে প্রশাসনিক কাঠামো ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যেখানে নোটিশ বোর্ডে ২০১৬ সালের বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা দিয়ে আসা সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১৭ জন শিক্ষকের স্থায়ীকরণ নিয়ে দুদকের তদন্ত চলছে এবং একই কারণে সিডিএ গার্লস স্কুলের অন্তত সাতজন অস্থায়ী ও খণ্ডকালীন শিক্ষকের স্থায়ীকরণ আটকে রয়েছে, সেখানে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই সৈয়দা নিলুফা আক্তারের স্থায়ী পদে বহাল থাকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সৈয়দা নিলুফা আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি এবং বর্তমানে সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত আছি। পরিচালনা কমিটি আমাকে উক্ত পদে স্থায়ী করেছেন। এ বিষয়ে জানতে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নুরুল আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ঘটনা দুটি ২০১৬ সালের হওয়ায় আমার পুরোটা স্পষ্ট মনে নেই। তবে রেজুলেশনে আমার স্বাক্ষর থাকতে পারে, আলাদা কোনো কাগজে স্বাক্ষর থাকার কথা নয়। আমি ঢাকা থেকে ফিরে কাগজপত্র দেখলে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারব।
১ মাস ১৯ দিন আগে
রেলওয়ের অনবোর্ড কর্মচারীদের প্রাপ্ত বেতনের টাকা মেরে খাচ্ছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশনের স্বত্তাধিকারী রেলের মাফিয়া ও রক্তচোষা খ্যাত শাহ আলম। অনবোর্ডে নিয়োগপ্রাপ্তদের অনুকুলে রেলওয়ে থেকে প্রতিমাসে বেতন প্রদান করা হলেও সেই টাকা জুটে না কোন কর্মচারীর। উল্টো শাহ আলমকে টাকা দিয়ে রেলের ডিউটি নিতে হয় তাদের।ফলশ্রুতিতে রেলের মাধ্যমে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ পাচার, গেস্ট পরিচয়ে বিনা টিকিটে তোলা শত শত যাত্রীর ভাড়া হাতিয়ে সরকারের রাজস্ব গিলে খাওয়াসহ নানা অপরাধ কর্মকান্ডের সাথে জড়িত নিরুপায় অনবোর্ড কর্মচারীরা। এমন তথ্য মিলেছে রেলে কর্মরতদের সাথে কথা বলে।সম্প্রতি এ বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রী উঠানামার ফাঁকে কথা হয় সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সঙ্গে। তারা জানান, রেলওয়েতে জনবল সংকটের অজুহাতে অনবোর্ডে ঠিকাদারের মাধ্যমে কয়েকটি পদে জনবল নিয়োগ দেয়া হয়। পদগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ম্যানেজার, স্টুয়ার্ড, পিএ অপারেটর ও ক্লিনার।মজুরী কাঠামোর আওতায় এসব কর্মচারীর মধ্যে সর্বনিম্ন বেতন ১৭ হাজার ৫০০ টাকা ধরা হয় ক্লিনার পদের জন্য। আর সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা বেতন ধরা হয় ম্যানেজারে পদের জন্য। বাকি পদগুলোর অনুকুলে প্রদত্ত বেতনের মধ্যে ২-১ হাজার টাকা তারতম্য রয়েছে।সুনির্দিষ্ট জনবলের অনুকুলে প্রতিটি রেলের জন্য প্রতিমাসে ৬-৭ লাখ টাকা বেতন প্রদান করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এভাবে ৫টি ট্রেনের অনবোর্ড থেকে পাওয়া ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা বেতন প্রদান করা হয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশনকে।ট্রেনগুলো হচ্ছে-সুবর্ণ এক্সপ্রেস, গোধুলী এক্সপ্রেস, মহানগর এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস। আর এসব ট্রেনে কর্মরত অনবোর্ড কর্মচারীদের একজনও সেই বেতনের এক টাকাও পাই না। উল্টো টাকা দিয়ে ট্রেনে ডিউটি নিতে হয় অনবোর্ড কর্মচারীদের। ফলে বেতন জোগাড় করতে রাষ্ট্রবিরোধী নানা অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে কর্মচারীরা।এর মধ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ, গাঁজা ও ফেনসিডিল পাচার অন্যতম। গত ৪ আগস্ট ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে ৪ হাজার ৮৫০ পিস ইয়াবাসহ স্টুয়ার্ড মাহবুর রহমানকে (২০) গ্রেপ্তার করে র্যাব। এর আগে গত বছর ২৯ মার্চ এই কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৩৩ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে ঢাকা রেলওয়ে পুলিশ।এছাড়া বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা, ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও যশোর রেলওয়ে স্টেশনেও ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ, গাঁজা ও ফেনসিডিল উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। যা একই সুত্রে গাথা বলে জানিয়েছেন র্যাব-৭ এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এ আর এম মোজাফফর হোসেন।র্যাবের এই কর্মকর্তার মতে, স্টুয়ার্ড মাহবুর রহমান যেহেতু ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশনের নিয়োজিত কর্মী, সে হিসেবে এই ইয়াবা বা মাদক পাচারের ঘটনায় ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ দায় এড়াতে পারে না। এ ঘটনায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ বা ট্রেনের চালক থেকে নিয়ে কর্মকর্তাদের আর কেউ জড়িত আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি র্যাবের নজরদারিতে রয়েছে।শুধু ইয়াবা বা মাদক পাচার নয়, চলন্ত ট্রেনে বান্দরবানের ১৯ বছরের এক তরুণীকে ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটিয়েছে শাহ আলমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশনের তিন কর্মী। এরা হলেন মো. জামাল (২৭), মো. শরীফ (২৮) ও মো. রাশেদ (২৭)। সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেসে এই জঘন্য কাজে লিপ্ত হয় তারা।এছাড়া শাহ আলমের গেস্ট পরিচয়ে শত শত যাত্রী বিনা টিকিটে প্রতিটি ট্রেনে তোলা হয়। এসব যাত্রীর টিকেটের অর্থ হাতিয়ে নেয় শাহ আলমের অনবোর্ড কর্মচারীরা। এভাবে প্রতিদিন অনবোর্ডের ৫টি ট্রেন ও ক্যাটারিংয়ের ২টি ট্রেন থেকে গেস্ট যাত্রীর ভাড়া বাবদ ৫-৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে শাহ আলম। যা মাসে দেড় কোটি টাকারও বেশি। ক্যাটারিংয়ের ট্রেনগুলো হলো পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেস।আর সরকারি রাজস্বের এসব টাকার একটি অংশ দিতে হয় শাহ আলমকে। বাকি অংশ ভাগাভাগি হয় অনবোর্ড কর্মকর্তা-কর্মচারী লোকোমাষ্টার, টিটি, স্টেশন ম্যানেজার, রেলওয়ের কমার্শিয়াল চীফ, আরএনবি ও জিআরপির মধ্যে। ভাগবাটোয়ারা সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছে এস এ কর্পোরেশনের স্বত্তাধিকারী শাহ আলমের শ্যালক (বউয়ের ভাই) সম্রাট ও ওরফে কালোবাজারী সম্রাট।কর্মচারী নিয়োগেও কোটি টাকার বানিজ্যচাকরি যখন সোনার হরিণ, সেখানে রেলওয়ের চাকরির কথা শুনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে লাখো বেকার তরুণ-তরুণী। যাদের কাছ থেকে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা করে আদায় করেছে শাহ আলম। নিয়োগের সময় বেতনের লোভ এবং দৈনিক ৫-১০ হাজার থেকে লাখ টাকা আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বেকার তরুণ-তরুণীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয় বলে জানান ভুক্তভোগীরা।ভুক্তভোগীরা অভিযোগ তুলেন, লাখো তরুণ-তরুণী থেকে লাখ টাকা হিসেবে কোটি কোাটি টাকা আদায় করলেও সবার ভাগ্যে জুটেনি চাকরি। যাদের অনেকেই এখনো কেঁদে ফিরছে। এর মদ্যে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার আনিছুর রহমান, নজরুল ইসলাম, আনোয়ারা উপজেলার বারশত ইউনিয়নের আবদুর রাজ্জাক এবং চট্টগ্রামে বসবাসকারী কুমিল্লা জেলার নুসরাত জাহান অন্যতম।আনিছুর রহমান জানান, ২০২২ সালে রেলে স্টুয়ার্ড পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা আদায় করে এস এ কর্পোরেশন। বাবার শেষ সম্বল জমি বিক্রি করে এই টাকা দিয়েছি আমি। কিন্তু আমার চাকরি হয়নি। যোগাযোগ করলে বলে, রেলে এখন নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ, নিয়োগ শুরু হলে চাকরি হবে।ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমার সাথে অনেকের চাকরি হয়েছে, আমার হলো না কেন? পরে বুঝতে পারলাম, আমার সাথে প্রতারণা করেছে এস এ কর্পোরেশন। টাকা ফেরত দিতে বললেও তারা টাকা ফেরত দিচ্ছে না। টাকা নেওয়ার কোন প্রমাণ না রাখায় রেল কর্তৃপক্ষ কোন অভিযোগও নিচ্ছেন না। আইনগত কোন ব্যবস্থাও আমি নিতে পারছি না।প্রায় একই কথা বলেছেন চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারশত ইউনিয়নের আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, চাকরি দেওয়ার কথা বলে আমার থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়েছে এস এ কর্পোরেশন। কিন্তু আমার চাকরি হয়নি। টাকা নেওয়ার কোন ডকুমেন্টস দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। টাকা ফেরত চাইলে বলছে, নিয়োগ শুরু হলে চাকরি হবে। অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু অপেক্ষা করতে গিয়ে আমার সার্টিফিকেটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এখন ভবিষ্যত অন্ধকার। তাদের মতো শত শত তরুণ-তরুণী এস এ কর্পোরেশনের প্রতারণার ফাঁদে সর্বস্ব হারিয়ে সর্বশান্ত হয়েছে বলে জানান তারা।এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের কমার্শিয়াল বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিয়োগ বানিজ্য তো হয়েছে, লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরও যারা নিয়োগ বঞ্চিত তাদের কান্না দেখলে আপনিও সইতে পারবেন না। আর যারা নিয়োগ পেয়েছে তাদের কাউকে নিয়োগপত্র দেয়নি এস এ কর্পোরেশন। তাদের কেউ বেতনও পায় না। তারা আকাম-কুকাম করে চলে।তিনি বলেন, আকাম-কুকাম থেকে উল্টো টাকা দিতে হয় শাহ আলমকে। অন্যথায় ট্রেনে উিউটি পায় না তারা। এ জন্য অনবোর্ড টেন্ডারে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি লোক নিয়োজিত করে রেখেছে শ্রমিকের রক্তচোষা শাহ আলম। যা অনবোর্ড টেন্ডারের শর্তের পুরোপুরি লঙ্ঘন। শাহ আলমের এসব কাজে রেলের ভাবমুর্তি নষ্ট হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।অনবোর্ডে কর্মচারী নিয়োগের বিষয়ে তথ্য চাইতে গেলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের কমার্শিয়াল বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এডমিন) মোছাম্মৎ কামরুন্নেছা বলেন, আমার কাছে কোন তথ্য নেই। আমি এসব বলে বিপদে পড়তে চাই না। আপনি কমার্শিয়াল চিফের সাথে যোগাযোগ করুন।তবুও কালো নয়, রেল কর্মকর্তাদের চোখে সেরা লাইসেন্স এস এ কর্পোরেশনঅনবোর্ড, ক্যাটারিং ছাড়াও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে টেন্ডারবাজি, জমি দখলবাজি, ঠিকাদার সমিতির নামে চাঁদাবাজি, রেলওয়ের স্ক্র্যাপ পাচারের মতো নানা কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশন।এসব অপরাধে যেখানে এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স কালো তালিকাভূক্ত হওয়ার কথা, সেখানে ভাগবাটোয়ারার প্রভাবে রেলওয়ে কর্মকর্তাদের চোখে সেরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশন। ফলে অনবোর্ড-ক্যাটারিংসহ রেলওয়ের অধিকাংশ টেন্ডার এস এ কর্পোরেশন ছাড়া আর কারও ভাগ্যে জুটে না বলে মন্তব্য করেন ঠিকাদাররা।ঠিকাদাররা জানান, গত ৩০-৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রেলওয়ের সব বিভাগের অধিকাংশ টেন্ডার এস এ কর্পোরেশনের কব্জায়। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আপত্তি উঠলেও রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও সহায়তায় আদালতের স্ট্রে-অর্ডার নিয়ে টেন্ডার হাতছাড়া করেনি শাহ আলম।নাছির উদ্দিন মোহন নামে এক ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাম করে বলেন, শাহ আলম আর আমি রেলওয়েতে একই সময়ে ঠিকাদারি কাজ শুরু করি। কিন্তু আজ শাহ আলম কোথায় আর আমি কোথায়। শাহ আলম কোটি টাকার প্রাডো গাড়ি দৌড়ায়। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, রাজশাহী থেকে খুলনায় শাহ আলমের বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম-রাজশাহীতে ফ্লাইটে যাতায়াত করে। শাহ আলম এখন রেলের রাজা খ্যাত। কিন্তু সে যা করে তা মাফিয়া ডনকেও হার মানায়। রেলের বুকে এমন কোন অপরাধ নেই সে জড়িত নেই। নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির সাথে সে জড়িত। দুদকে তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগও রয়েছে। এরপরও থেমে নেই শাহ আলম।যা বললেন শাহ আলমএ বিষয়ে জানতে এস এ কর্পোরেশনের স্বত্তাধিকারী শাহ আলমের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও কল রিসিভ করেননি তিনি। পরে হোয়াট্স অ্যাপ মেসেঞ্জারে খুদে বার্তা লিখে পাঠালে প্রতি উত্তরে তিনি লিখেন, অপরাধের সাথে যারা জড়িত তারা তো ব্যক্তি। তাদের দায়ভার প্রতিষ্ঠান নিভে কেন? নিয়োগ তো প্রতিষ্ঠানের দায়ভার কেন নয়-এমন প্রশ্নের জবাবে শাহ আলম বলেন, অপরাধে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা তিনি না বলে এড়িয়ে যান।অনবোর্ড-ক্যাটারিং কর্মচারীরা বেতন পায় না, উল্টো টাকা দিয়ে ডিউটি নিতে হয়-এমন অভিযোগের জবাবে শাহ আলম লিখেন, আমি এখন ঢাকায় যাচ্ছি, ফ্লাইটে উঠতেছি। নেটওয়ার্ক নাই। ২-৩ দিনের মধ্যে ঢাকা থেকে আসবো। আপনার সাথে বসব। এ কথা বলে তিনি ফোনের সংযোগ কেটে দেন।রেলওয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতএস এ কর্পোরেশনের স্বত্তাধিকারী শাহ আলমের নানা অভিযোগের বিষয়ে মতামত চাইতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বানিজ্যিক ব্যবস্থাপক সঞ্জিত কুমার বিশ্বাসের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে গত ১৬ আগস্ট রবিবার ও ১৭ আগস্ট সোমবার দু‘দিন অফিসে সাক্ষাৎ করার জন্য গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। একইভাবে অতিরিক্ত প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক মো. শওকত জামিল মোহসীও অফিসে ছিলেন না। দু‘দিনেই তারা ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে জানান অফিস সহকারীরা।পরে এ বিষয়ে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান (অবকাঠামো) মুঠোফোনে বলেন, ইয়াবা পাচার, তরুণী ধর্ষণসহ যেসব ঘটনা ঘটছে তা রেলের নিরাপত্তা ও ভাবমূতি প্রশ্নবিদ্ধ,-এটা নিসন্দেহে স্বীকার করতে হয়। তবে এসব ঘটনায় জড়িতরা কিন্তু রেলওয়ের স্থায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত নয়। এসব অপরাধী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নিয়ুক্ত লোক। এক্ষেত্রেও ব্যক্তির দায় প্রতিষ্ঠান নিবে কেন-এমন প্রশ্ন আসতে পারে।এসব অপরাধের সাথে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মালিক যে জড়িত নয়, এটা বলা যায় কীভাবে-এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, থাকতেও পারে, না থাকতেও পারে। এটা খতিয়ে দেখার বিষয়। এস এ কর্পোরেশনের মালিক শাহ আলম নিজেই দখলবাজি-টেন্ডারবাজিসহ নানা অপরাধের সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি সামনে আনা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি দেখাশুনা করেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম। আপনি উনার সাথে কথা বলুন। কিন্তু অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাজমুল ইসলামের (অপারেশন) মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।(বিশেষ দ্রষ্টব্য : রেলের মাফিয়া খ্যাত ঠিকাদার শাহ আলমের অনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন-৩ প্রকাশ হলো। চতুর্থ প্রতিবেদন শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে। প্রিয় পাঠক চোখ রাখুন দৈনিক ঈশানের অনলাইন ও প্রিন্ট ভার্সনে)এ সংক্রান্ত আরও :ধারাবাহিক প্রতিবেদন-১ । ট্রেনে ইয়াবা পাচারে এস এ কর্পোরেশন, অধরা মূলহোতা শাহ আলম!ধারাবাহিক প্রতিবেদন-২, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ঠিকাদার এসোসিয়েশনের কোটি টাকার চাঁদাবাজি
১ মাস ২৩ দিন আগে
চট্টগ্রাম ওয়াসার কাগজে কলমে ৮৬ কোটি টাকা হিসাবে আছে, কিন্তু ক্যাশে নেই। এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে অডিট আপত্তিতে। নতুন নয়, সাত বছর ধরে বার বার এমন চিত্র ঘুরে ফিরে আসছে অডিটে। কিন্তু প্রতিবারই নীরব থেকেছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। বিপুল এই টাকা কোথায় আছে, কোথায় ব্যয় হয়েছে কিংবা আদৌ এর অস্তিত্ব আছে কি না— এর কোনো নথিপত্র নেই ওয়াসার কাছে। সাত বছরের অডিট প্রতিবেদন সংস্থাটির আর্থিক এই অনিয়মের চিত্র সামনে আসলেও ওয়াসার কর্মকর্তারাও কোন হদিস দিতে পারছেন না। বরং আর্থিক এই অনিয়মকে আড়াল করতে গায়েব করা হয়েছে নথিপত্র। কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা তদন্ত করে বের করা উচিত বলে মনে করছেন আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা। সর্বশেষ অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ৮৬ কোটি ৬ লাখ ৬২ হাজার ৩২৯ টাকার এই ইকুইটি দেখানো হলেও তা যাচাইয়ের মতো পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত সহায়ক নথি ওয়াসা কর্তৃপক্ষ দিতে পারেনি। এমনকি এ বিষয়ে তাদের কোনো স্পষ্ট বক্তব্যও নেই।নিরীক্ষকদের ভাষ্য, ইকুইটি বলতে বোঝায় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মূলধন। অতীতে কোনো এক সময় কোনো একটি উৎস থেকে এই অর্থ ওয়াসার তহবিলে যুক্ত হয়েছিল বলে হিসাবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তা নগদ অর্থ হিসেবে ব্যাংকে জমা আছে, নাকি কোনো সম্পদ কেনায় খরচ হয়ে গেছে। তার কোনো হদিস মিলছে না। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সর্বশেষ অডিট করে এমআরএইচ দে অ্যান্ড কোম্পানি। যাদের প্রতিবেদন জমা পড়ে ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ও ৯ জুন। গত ২২ জুন ওয়াসার কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটির সভায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অডিট প্রতিবেদনটি গৃহীতও হয়। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরের অডিটও করে প্রতিষ্ঠানটি। এভাবে এর আগে ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষা করে খান ওয়াহাব শফিক রহমান অ্যান্ড কোম্পানি। তাদের প্রতিবেদন দুটি জমা পড়ে যথাক্রমে ২০২১ সালের ২৪ জুন ও ২০২২ সালের ৬ জুলাই। এই দুই অর্থবছরের প্রতিবেদনেই নিরীক্ষকরা আর্থিক ওই গরমিলের তথ্য তুলে ধরেন। তাদের কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন বা শর্তযুক্ত মতামত অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ওয়াসা তাদের মূল তহবিলের অন্তর্ভুক্ত ‘ইকুইটি’ খাতে ৮৬ কোটি ৬ লাখ ৬২ হাজার ৩২৯ টাকা আর্থিক বিবরণীতে দেখিয়েছে। কিন্তু বিপুল টাকা জমার কোনো ব্যাংক রসিদ, চালান বা মূল নথি সরবরাহ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।অন্যদিকে ২০১৯-২০, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরের নিরীক্ষা করে রহমান মোস্তফা আলম অ্যান্ড কোম্পানি। তাদের বার্ষিক চূড়ান্ত হিসাবে প্রতিবেদন জমা পড়ে ২০২৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর এবং ২০২৫ সালের ২৩ জুন। এই তিন বছরের অডিটেও একই অঙ্কের ইকুইটি দেখানো হয়, কিন্তু নিরীক্ষকদের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কোনো উপযুক্ত কাগজপত্র বা সোর্স ডকুমেন্ট সরবরাহ করতে পারেনি ওয়াসা। প্রয়োজনীয় নথি না পাওয়ায় অডিট দল এই অর্থের অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি।সাত বছর ধরে প্রতিটি অডিট প্রতিবেদনেই একই ধরনের গুরুতর আর্থিক অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। নিরীক্ষকরা বারবার ব্যাংক রসিদ বা সরকারি আদেশের মতো সোর্স ডকুমেন্ট চাইলেও তা সরবরাহে প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের মতে, টাকার হিসাব যদি থাকে, তাহলে এই টাকা কোথা থেকে এসেছে, কোথায় ব্যয় হয়েছে তার নথি অবশ্যই থাকতে হবে। যদি না থাকে, তাহলে বুঝতে হবে কোনো আর্থিক অনিয়ম আড়াল করতে এই নথি গায়েব করা হয়েছে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’ যদিও গত ৯ জুন সর্বশেষ অডিট প্রতিবেদনে তিনি যে স্বাক্ষর করেছেন, সেখানে এই অনিয়মের বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।আবার সংস্থাটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ) শারমিন আক্তার স্বীকার করে বলেছেন, এই টাকা মূলধন তহবিলে দেখালেও এর সমর্থনে কোনো নথিপত্র নেই। এটি সরকার কোনো এক সময় মূলধন হিসেবে দিয়েছিল। কিন্তু নথিপত্র না থাকায় কোথায় খরচ হয়েছে, তা বলা সম্ভব হচ্ছে না। এই অডিট আপত্তি সমাধানের জন্য বিষয়টি বোর্ডসভায় তোলা হবে।আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম ওয়াসার এই আর্থিক অস্বচ্ছতা ও নথিপত্র গায়েবের ঘটনা শুধু অডিট আপত্তি নয়; বরং প্রচলিত একাধিক সরকারি আইন ও হিসাবমানের স্পষ্ট লঙ্ঘন। আর্থিক বিবরণীতে নথিপত্র না দেখিয়ে হিসাব প্রস্তুত করা ‘ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন, ২০১৫’ অনুযায়ী আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। উপযুক্ত চালান বা সোর্স ডকুমেন্ট ছাড়া ক্যাপিটাল ফান্ডের কোটি কোটি টাকা দেখানো ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯’-এর বড় ব্যত্যয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা মানদণ্ডের লঙ্ঘন হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তারা। এ ছাড়া কাল্পনিক হিসাব দেখানো দণ্ডবিধির ৪৭৭-এ (হিসাব জালিয়াতি) ধারার আওতায় গুরুতর অপরাধ।
২ মাস ৯ দিন আগে