স্টারলিংকের স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল সেবায় যুক্ত হলো বাংলাদেশ। মোবাইল অপারেটর বাংলালিংকের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে চালু হওয়া এ সেবাকে স্বাগত জানিয়েছেন স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ও বিশ্বের র্শীষ ধনী ইলন মাস্ক।
বৃহস্পতিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যেগাযোগমাধ্যম এক্সে স্টারলিংকের একটি পোস্ট শেয়ার করে তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে এখন স্টারলিংক মোবাইল অ্যাভেইলেভল!’ এরপর আরেক পোস্টে বাংলাদেশে স্টারলিংকের সংযোগ বিস্তারের বিষয়েও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘স্টারলিংক বাংলাদেশকে সংযুক্ত করছে!’
স্টারলিংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলালিংকের মাধ্যমে চালু হওয়া এই সেবায় প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের কাভারেজের বাইরে থাকা এলাকাতেও সামঞ্জস্যপূর্ণ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে যোগাযোগের সুযোগ পাওয়া যাবে।
স্পেসএক্সের দাবি, লাখো গ্রাহক মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতার বাইরে থেকেও বিভিন্ন অ্যাপে বার্তা পাঠাতে, অবস্থান শেয়ার করতে এবং সংযুক্ত থাকতে পারবেন। কোম্পানিটির বাণিজ্যিক বিক্রয় বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টেফানি বেডনারেকও বাংলাদেশে সেবাটি চালুর বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
যেভাবে নিতে হবে সংযোগ ?
ডিশনির্ভর প্রচলিত স্টারলিংক ইন্টারনেটের সঙ্গে নতুন এই সেবার পার্থক্য রয়েছে। স্টারলিংক মোবাইল ব্যবহারের জন্য আলাদা স্যাটেলাইট ডিশের প্রয়োজন নেই। একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ৪জি ফোন ও বাংলালিংকের সিম থাকলেই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মোবাইলটি সরাসরি স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে আকাশের দিকে তুলনামূলক পরিষ্কার দৃষ্টিসীমা প্রয়োজন হবে।
বাংলালিংক জানিয়েছে, জরুরি পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাটে প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই সেবা বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। জেলে, সমুদ্রে কর্মরত ব্যক্তি, ভ্রমণকারী এবং প্রত্যন্ত ও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্যও এটি বাড়তি যোগাযোগ সুবিধা দিতে পারে।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার গভীর সমুদ্র এলাকাতেও এ সেবা ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে বাংলালিংক। বিশেষ করে যেখানে মোবাইল টাওয়ারের কাভারেজ পৌঁছায় না, সেখানে স্যাটেলাইটনির্ভর সংযোগ একটি বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।
মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি দিতে হবে যত
স্টারলিংক ইন্টারনেটের মূলত দুই ধরনের প্যাকেজ আছেঃ পারসোনাল এবং বিজনেস। পারসোনাল বা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য আবার দুই ধরনের প্যাকেজঃ রেসিডেন্সিয়াল এবং রোম। বাসাবাড়িতে ব্যবহারের জন্য রেসিডেন্সিয়াল প্যাকেজটি ডিজাইন করা হয়েছে। এটি আপনি একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে ব্যবহার করতে পারবেন। অর্থাৎ মডেমের অবস্থান খুব বেশি পরিবর্তন করা যাবেনা। রেসিডেন্সিয়াল প্যাকেজের আবার দুটি ধরণ আছে। রেসিডেন্সিয়াল এবং রেসিডেন্সিয়াল লাইট।
বর্তমানে রেসিডেন্সিয়াল লাইট প্যাকেজের মাসিক খরচ ৪২০০ টাকা। অপরদিকে রেসিডেন্সিয়াল প্যাকেজের মাসিক খরচ ৬০০০ টাকা। উভয় প্ল্যানেই আনলিমিটেড ডেটা পাবেন। (লাইট প্ল্যানে স্পিড একটু কম পাবেন)। আর হ্যাঁ, বাসায় সেটআপের জন্য এর এন্টেনা কিনতে হবে যার নাম “স্টারলিংক স্ট্যান্ডার্ড কিট”। এই কিট কেনার জন্য এককালীন খরচ হবে ৪৭ হাজার টাকা। সুতরাং আপনার এককালীন একটা খরচ কিন্তু থাকছেই।
ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য আরেকটি প্যাকেজ আছে যার নাম “রোম”। এই রোম প্যাকেজটি হচ্ছে ডিজিটাল নোম্যাড কিংবা ভ্রমণকারীদের জন্য, যারা বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা করে। তার মানে হচ্ছে আপনি রোম প্যাকেজ দিয়ে যেকোনো জায়গায় স্টারলিংক ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন। অবশ্য সেসব স্থানে স্টারলিংক নেটওয়ার্ক এভেইলেবল থাকতে হবে।
রোম আনলিমিটেড প্যাকেজের সাবস্ক্রিপশন ফি মাসে ১২ হাজার টাকা। তবে এর আরও একটি প্যাকেজ আছে যেটির খরচ মাসে ৬০০০ টাকা, যাতে আপনি মাসে ৫০জিবি ডেটা পাবেন। তবে এখানেই শেষ না। রোম প্যাকেজ চালাতে হলেও আপনাকে স্টারলিংক কিট (অর্থাৎ এন্টেনা) কিনতে হবে। এক্ষেত্রে দুই ধরনের এন্টেনা পাবেন। একটি হচ্ছে মিনি, যা স্কুলব্যাগ সাইজের, যার দাম ২৪ হাজার টাকা। অন্যটি হলো স্ট্যান্ডার্ড কিট যা একটু বড় সাইজের এবং দাম ৪৭ হাজার টাকা।
এছাড়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্যও অনেক প্রকার ইন্টারনেট প্যাকেজ অফার করে স্টারলিংক। তবে সেগুলো নির্দিষ্ট টার্মস দ্বারা পরিচালিত হয়। সেগুলোর খরচও আলাদা আলাদা হয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম বাংলাদেশ
বাংলালিংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশই দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ যেখানে স্টারলিংক মোবাইল সেবা চালু হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশ সরকার বাংলালিংক ও স্টারলিংককে প্রচলিত নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা এলাকায় স্যাটেলাইটভিত্তিক ডিরেক্ট-টু-সেল সেবার পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অনুমতি দিয়েছিল।
বাংলাদেশে সেবাটি চালু হলেও প্রতিবেশী ভারতে স্টারলিংকের মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড সেবা চালুর প্রক্রিয়া এখনো নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে। ভারতের বাজারে প্রবেশের বিলম্ব নিয়ে দেশটির প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী আম্বানি গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন ইলন মাস্ক।
ভারতের সমালোচনা করে তিনি লিখেছেন, ‘বিশ্বের ১৬৫টি দেশে স্টারলিংকের লাইসেন্স আছে। ভারতের সরকারের প্রতিটি আইন মানার পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার পরও কেন ভারতে এখনো লাইসেন্স নেই? ভারতের আসল বস কী তাহলে আম্বানি?’
ভারত সরকার অবশ্য মাস্কের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, স্যাটেলাইট যোগাযোগের নিয়ন্ত্রক কাঠামো বৈষম্যমূলক নয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা যাচাই চলছে।