গ্যাস সংকটের মাঝে মিলেছে ‘স্বস্তির বার্তা’। বুধবার দিনগত মধ্যরাত থেকে চালু হতে পারে সপ্তাহ দুয়েক আগে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালটি। এতে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে দেশজুড়ে। এমন আভাস দিয়েছে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল)।সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, টার্মিনালটিতে রিগ্যাসিফিকেশন (তাপ প্রয়োগ করে মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসকে (এলএনজি) পুনরায় আগের গ্যাসীয় অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া) শুরু হলে ধাপে ধাপে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে। উন্নতি হবে সারাদেশে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিরও।আরপিজিসিএল সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহ যুক্ত হতে পারে। এরপর চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারবে।এর আগে গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলে এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালনায় থাকা ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) শিপ-টু-শিপ পদ্ধতিতে গ্যাস স্থানান্তরের সময় বিস্ফোরণের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এই দুর্ঘটনার ফলে টার্মিনালটির কার্যক্রম দুই সপ্তাহ ধরে বন্ধ।সে সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, বিকল হয়ে যাওয়ার আগে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালটিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ঘটনার সময় একটি এলএনজি কার্গো টার্মিনালটির কাছাকাছি অবস্থান করছিল, যা বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারত। তবে দ্রুত সেটিকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।অগ্নিকাণ্ডের কারণ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, প্রাথমিকভাবে বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা। তবে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কিছু যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। এ ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা এক্সিলারেট, সামিট কিংবা বাংলাদেশ সরকারের কারও ছিল না। এটা একটা নতুন অভিজ্ঞতা।ওই অগ্নিকাণ্ডের ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে গিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গৃহস্থালিতে মারাত্মক গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। ফলে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকায় গত দুই সপ্তাহ ধরে বাসাবাড়ির গ্রাহকরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাসের চাপ খুবই সীমিত। ফলে অনেকেই রান্নাবান্না করতে পারছেন না। সে কারণে অনেকেই বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।এরইমধ্যে ইলেকট্রিক চুলা, রাইস কুকার কিনেছেন কেউ কেউ। একইসঙ্গে গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে। গ্যাসের স্বল্পতায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন শিল্পমালিকরা।অন্যদিকে গ্যাসের চাপ কম থাকায় সারাদেশের সিএনজি স্টেশনগুলোতে প্রতিদিনই অটোরিকশার দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেক স্টেশন তো পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি চালু হলে ধীরে ধীরে বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও সিএনজির গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।যদিও জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টার্মিনালটি পুরো সক্ষমতায় চালু হতে আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। প্রাথমিকভাবে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তারা।আরপিজিসিএলের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদেশি প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের একটি বিশেষজ্ঞ দল দিনরাত পরিশ্রম করে টার্মিনালটির ক্ষতিগ্রস্ত বয়লার ও অন্যান্য কারিগরি ত্রুটির সফল মেরামত সম্পন্ন করেছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই এটি পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাবে।প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে দেশে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়ায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা এবং সরকারের ভর্তুকি- উভয়ই বেড়েছে।
২ মাস ৪ দিন আগে
জুন ও জুলাই মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। শহর থেকে গ্রামাঞ্চলের অনেক গ্রাহকও অভিযোগ করছেন, আগের মাসের তুলনায় তাদের বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কারও বিল দ্বিগুণ, কারও তিনগুণ, আবার কোথাও পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি এসেছে।সামাজিক মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিলের কপি প্রকাশ করে ক্ষোভ জানাচ্ছেন অসংখ্য গ্রাহক। কেউ দাবি করেছেন, পুরো মাস বাড়িতে না থাকলেও আগের তুলনায় বেশি বিল এসেছে। আবার কেউ বলছেন, আগে যেখানে মাসে দুই হাজার টাকার কম বিল দিতেন, এবার সেখানে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। তবে সোমবার এক বিজ্ঞপ্তিতে বিদ্যুৎ বিভাগ বিষয়টিকে অপপ্রচার আখ্যা দিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত যতগুলো অভিযোগ জমা পড়েছিল, তা বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থাগুলো যৌথভাবে সমাধান করেছে। এরপরও যদি কোনো গ্রাহকের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে প্রয়োজনীয় প্রমাণসহ কাছের অফিসে আবেদনের আহ্বান জানানো হয়েছে। লিখিত আবেদন পেলে দ্রুততম সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত গুজব ও অসত্য তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।গ্রাহকদের অভিমতচট্টগ্রাম পাঁচলাইশ এলাকার বাসিন্দা খায়রুল ইসলামের মতে, তার পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যবহার গত কয়েক মাসে তেমন পরিবর্তন হয়নি। প্রতি মাসে তার বিল ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে থাকত। কিন্তু জুন মাসে তার বিল আসে প্রায় ৬ হাজার টাকা। হঠাৎ চার গুণের বেশি বিল দেখে তিনি সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ করেন। তার প্রশ্ন, ব্যবহার প্রায় একই থাকলেও বিল এত বেড়ে গেল কীভাবে?একই ধরনের অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকেরা। তাদের দাবি, জুন-জুলাই মাসে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় এসি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রও স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা যায়নি। তারপরও আগের মাসের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি বিল এসেছে। তাদের ভাষ্য, বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকলে ব্যবহারও কম হওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে এত বেশি বিলের যৌক্তিকতা তারা খুঁজে পাচ্ছেন না।শুধু পোস্টপেইড নয়, প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকদের মধ্যেও একই ধরনের ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকার অনেক গ্রাহক বলছেন, আগে যে পরিমাণ টাকা রিচার্জ করলে প্রায় এক মাস বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যেত, এখন একই পরিমাণ টাকা দুই সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। মিটার পরীক্ষা করিয়েও তারা স্পষ্ট কোনো কারণ জানতে পারেননি। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুতের ব্যবহার আগের মতোই থাকলেও রিচার্জের টাকা অস্বাভাবিক দ্রুত কেটে যাচ্ছে।পাভেল বড়ুয়া নামে একজন বলেন, ১ হাজার টাকা রিচার্জ করে বিদ্যুৎ পেলাম ৭০৮ টাকার। মানে ২৯২ টাকা নাই। এর মধ্যে ডিমান্ড চার্জ ১৬৮, ভ্যাট ৪৭। কারা জানি বলেছিলেন মিটার ভাড়া নেবে না সরকার! আমার তো নিল ৮০ টাকা। এভাবে ১ হাজারে ৭০০ টাকা মানে ৩০০ টাকা নাই হয়ে যাওয়াকে সাগর-চুরি বলে মনে করি আমি।এ ধরনের অভিযোগ শুধু একজন বা দুটি এলাকার নয়। নগরীর পাহাড়তলী, পতেঙ্গা, গোসাইলডাঙ্গ, ফিরিঙ্গিবাজার, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকাম ফরিদের পাড়া, কাপাসগোলা, বাকলিয়া, চাক্তাই, সদরঘাটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক গ্রাহকের দাবি, দিনের বড় অংশ লোডশেডিংয়ে কাটলেও তাদের বিদ্যুৎ বিল আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে।এসব অভিযোগে স্পষ্ট, অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। তাই বিষয়টি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।পোস্টপেইড গ্রাহকদের অভিযোগ, কোথাও মিটার রিডিংয়ে ভুল হয়েছে, কোথাও অনুমাননির্ভর বিল করা হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে একাধিক মাসের ইউনিট একসঙ্গে সমন্বয় করায় বিল হঠাৎ বেড়ে গেছে। অনেক গ্রাহক বিল হাতে পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করছেন।বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যাখ্যাঅস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগের পর বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, জুন মাসে তীব্র গরমের কারণে সারা দেশে বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। বিশেষ করে এসি, ফ্রিজ, পাখা ও কুলারের ব্যবহার বাড়ায় অনেক গ্রাহকের বিদ্যুৎ খরচও আগের তুলনায় বেশি হয়েছে। তাছাড়া ঈদুল আজহার কারণে মে মাসে অনেক এলাকায় নির্ধারিত সময়ের আগেই মিটার রিডিং নেওয়া হয়। ফলে জুন মাসের বিলে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ দিনের বিদ্যুৎ ব্যবহার যুক্ত হয়েছে। এ কারণেও অনেকের বিল স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি এসেছে। একই কারণে জুলাই মাসের বিলেও কিছু ক্ষেত্রে এমন প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।এ ছাড়া কোথাও কোথাও মিটার রিডিংয়ে ভুল, বিল তৈরির ত্রুটি কিংবা একাধিক মাসের ইউনিট একসঙ্গে সমন্বয় করার কারণেও অস্বাভাবিক বিল হয়েছে বলে স্বীকার করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এসব অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।সন্তুষ্ট নন গ্রাহকরা, ছুড়ছেন প্রশ্নতবে বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন অনেক গ্রাহকরা। তাদের প্রশ্ন, গরমের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার কিছুটা বাড়লেও কীভাবে বিল দুই, তিন কিংবা পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে?অনেকের অভিযোগ, দিনের পর দিন লোডশেডিংয়ের কারণে এসি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র স্বাভাবিকভাবে ব্যবহারই করা যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ব্যবহারের যুক্তি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকদেরও অভিযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলেও রিচার্জের টাকা অস্বাভাবিক দ্রুত কেটে যাচ্ছে।নাগরিক সমাজের উদ্বেগজুন মাস থেকে বিদ্যুতের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বাড়ার পরই জুলাই মাসে অনেক গ্রাহকের অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল পাওয়ার অভিযোগ উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনেকের দাবি, আগের তুলনায় বিল দুই থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অভিযোগের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিল বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ নির্ধারণে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে। মিটার রিডিং, বিলিং সফটওয়্যার বা প্রযুক্তিগত ত্রুটি থাকলে তা দ্রুত সংশোধনের পাশাপাশি অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।সংগঠনটি অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি, বিল পুনর্মূল্যায়ন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিতর্কিত বিলে জরিমানা বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা এবং ভবিষ্যতে এমন সমস্যা এড়াতে বিলিং ব্যবস্থার নিয়মিত প্রযুক্তিগত নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের বিলের কপি, মিটারের রিডিং ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের আহ্বান জানানো হয়েছে। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, শুধু তীব্র গরম বা অতিরিক্ত কয়েক দিনের বিদ্যুৎ ব্যবহার দিয়ে এত বড় বিলের পার্থক্য ব্যাখ্যা করা যায় না। কোথাও মিটার রিডিংয়ে ত্রুটি, কোথাও বিলিং ব্যবস্থার দুর্বলতা কিংবা প্রশাসনিক গাফিলতি রয়েছে কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।বাড়তি বিলের ক্ষোভের মধ্যেও লোডশেডিংবিদ্যুৎ বাড়তি বিল নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে, তখনই দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতির দিকে যেতে শুরু করেছে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬২টি কোনো না কোনোভাবে জ্বালানি সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ২৬টি, তরল জ্বালানিভিত্তিক ৩৩টি এবং কয়লাভিত্তিক দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির পর থেকেই দেশের জ্বালানি পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি শুরু হয়। টার্মিনালটির কার্যক্রম আংশিক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ এক ধাক্কায় ১৭ শতাংশের বেশি কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।এর আগে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন গড়ে ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ২১০ কোটি ঘনফুটে। অথচ দেশের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহে প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে বিদ্যুৎ খাত। আগে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা কমে ৬৮ থেকে ৭০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন দেড় হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি কমেছে।গত সপ্তাহে গড় উৎপাদন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৮২ মেগাওয়াট, যা আগের সপ্তাহে ছিল মাত্র ৩২০ মেগাওয়াট। ১ আগস্ট ঘাটতি বেড়ে ২ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াটে পৌঁছে যায়। রোববার গভীর রাতে একপর্যায়ে ঘাটতি প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটে ওঠে। দিনের বেলাতেও অনেক সময় ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে।ভোগান্তি বেশি গ্রামাঞ্চলেলোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে গ্রামাঞ্চলে। অনেক এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর আবার এক বা দুই ঘণ্টা লোডশেডিং এখন অনেক এলাকার নিত্যদিনের ঘটনা।রাঙ্গুনিয়া উপজেলার একটি চালকলের মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, একদিনে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন কার্যত বন্ধ ছিল। আগে দুই-তিন ঘণ্টার লোডশেডিং কোনোভাবে সামলানো যেত, কিন্তু এখন পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে।কৃষি খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। সাতকানিয়ার মাছচাষি রহমত উল্লাহ জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ পাম্প চালাতে টানা তিন রাত লেগেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি কাজও নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি। জাতীয় গ্রিডে চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ, অতপর লোডশেডিংমাতারবাড়ী ও বাঁশখালী এসএস পাওয়ারের মতো মেগা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু থাকায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা স্থানীয় চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু বিদ্যুৎ পাঠানো হচ্ছে পুরো দেশের জাতীয় গ্রিডে। ফলে স্থানীয় চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। গত ৩০ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ-সংক্রান্ত সরকারি প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এই চিত্র উঠে এসেছে। সর্বশেষ সোমবার দুপুর ১টার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ ছিল ৯০০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ২০০ মেগাওয়াট। কাগজে-কলমে ২০০ মেগাওয়াটের লোডশেডিংয়ের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র এর চেয়ে খারাপ। রেশনিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে। টানা এক-দুই ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না জেলার কোনো এলাকায়।বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিতরণ দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কম পাওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে।’ সরবরাহ কেন কম সেটি তিনি জানেন না বলে জানান।চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল ভিত্তি এখন দুটি বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র। বাঁশখালীর এস আলমের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার কেন্দ্র থেকে ১ ও ২ আগস্ট টানা ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ যোগ হয়েছে জাতীয় ও স্থানীয় গ্রিডে। মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০ জুলাই সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট উৎপাদিত হয়। যদিও ৩১ জুলাই সাময়িক যান্ত্রিক ত্রুটিতে তা কমে ৭৯০ মেগাওয়াটে নামে। এ ছাড়া গ্যাসভিত্তিক শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি নিয়মিত ২০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন বজায় রেখেছে।বিপরীতে সরকারি পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ভিন্ন চিত্র মিলেছে। চট্টগ্রাম শহরঘেঁষা রাউজান ১ ও ২ নম্বর ইউনিট (প্রতিটি ২১০ মেগাওয়াট) দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। বন্ধ ছিল সিইপিজেডের ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ইউনাইটেড পাওয়ার প্ল্যান্টও। কক্সবাজারের বায়ু ও টেকনাফ-কাপ্তাইয়ের সৌরভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনেও ধারাবাহিকতা নেই। ৩০ জুলাই বেলা ১১টায় কক্সবাজার বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিললেও পরদিন একই সময়ে সেখান থেকে উৎপাদন নেমে আসে শূন্যে। কাপ্তাই, টেকনাফ ও কেইপিজেডের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো রাতে সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। আর মেঘলা দিনেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিদ্যুৎ দিতে পারছে না বলে তথ্যে উঠে এসেছে।লোডশেডিংয়ের এই বাস্তবতায় দুর্বিষহ দিন কাটছে নগরবাসীর। চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, সকালে খাবার তৈরি করতে রান্নাঘরে ঢুকে দেখি গ্যাস নেই। ভাবলাম কিছুক্ষণ শুয়ে থাকি। বেডরুমে গিয়ে দেখি বিদ্যুৎ নেই। এক দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি।হালিশহরের বাসিন্দা সুরাইয়া জান্নাত বলেন, রবিবার রাত ১টা ৩৫ মিনিটে বিদ্যুৎ চলে যায়। এক ঘণ্টা পর আসে। আবার ভোরে চলে যায়। আসে সকালের দিকে। রাতে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার কারণে বাচ্চারা গরমে ছটফট করতে থাকে।’ নগরের রাজাপুকুর লেনের বাসিন্দা পুতুল দাশগুপ্ত বলেছেন, তাদের বাসায় রাতে বিদ্যুৎ চলে যায়, আসে ভোররাতে।’বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের বিদ্যমান উৎপাদন দিয়েই স্থানীয় গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব। তবে জাতীয় সঞ্চালন গ্রিডের বণ্টন-নীতির কারণে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ চট্টগ্রাম থেকে টেনে নিয়ে রাজধানীসহ অন্যান্য এলাকার ঘাটতি মেটানো হচ্ছে। অথচ গ্যাস সরবরাহের বেলায় চট্টগ্রাম পুরোপুরি বঞ্চিত। চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ দেশের কোন কুপ থেকে আসে না, সম্পূর্ণ আমদানিকৃত তরল এলএনজির উপর নির্ভর। তদন্তের নির্দেশ সরকারের বিতর্ক বাড়তে থাকায় বিদ্যুৎ বিভাগ দেশের সব বিতরণ কোম্পানিকে দ্রুত অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যেসব গ্রাহকের বিল ব্যবহারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, সেগুলো পুনরায় যাচাই করতে হবে। তদন্তে ভুল প্রমাণিত হলে সংশোধিত বিল দিতে হবে।এ জন্য প্রতিটি বিদ্যুৎ বিতরণ অফিসে আলাদা অভিযোগ গ্রহণ সেল চালু করা হয়েছে। গ্রাহকরা বিল, মিটারের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র নিয়ে সেখানে আবেদন করতে পারবেন। প্রয়োজনে মিটার পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, জুন মাসের অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। বিতরণ কোম্পানিগুলোকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোথাও অনিয়ম, অবহেলা বা অসাধু কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।ইকবাল মাহমুদ বলেন, গরমের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার কিছুটা বাড়তে পারে। তবে প্রকৃত কারণ কী, সেটি তদন্ত করেই নিশ্চিত হওয়া হবে। কোনো গ্রাহক যেন অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
২ মাস ৬ দিন আগে
গ্যাস–সংকট সমাধানে মালয়েশিয়ার পর এবার মিয়ানমারের দ্বারস্থ হলো বাংলাদেশ সরকার। জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা পূরণে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ।রবিবার (২ আগস্ট) সচিবালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত এইচ. ই. ইউ কিয়াও সোয়ে মোয়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন।জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, দেশের অভ্যন্তরে প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে। এ চাহিদা পূরণে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানিতে বাংলাদেশ বিশেষ আগ্রহী। জবাবে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত এ প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন। তিনি পাইপলাইনের পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আকারেও বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। জ্বালানিমন্ত্রী এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেন।সাক্ষাৎকালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণে অতীতের প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় আনার বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। এ সময় দ্বিপাক্ষিক জ্বালানি সহযোগিতা আরও জোরদারে দুই দেশের জ্বালানিমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি মিয়ানমারের জ্বালানিমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে নিজেও মিয়ানমার সফরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এ করিডোর বাস্তবায়নে দুই দেশের মধ্যে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং জ্বালানি সহযোগিতা সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির আলোকে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও জোরদারে সরকারের আন্তরিক আগ্রহের কথাও জানান তিনি। জবাবে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠকে বিষয়টি পর্যালোচনা করা যেতে পারে।বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এবং বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ উপস্থিত ছিলেন।
২ মাস ৭ দিন আগে
গত ২১ জুলাই বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে সৃষ্ট অগ্নিকান্ডে কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। এতে পরিবহন খাত থেকে শিল্প কারখানা, এমনকি রান্নাবান্নায়ও হাহাকার শুনা যাচ্ছে শুধু।গ্যাসের এই নিম্নচাপে দিন দিন পিষ্ঠ হচ্ছে জনজীবন। ফলে যেকোনো মূল্যে দ্রুত এর সমাধান চান সাধারণ মানুষ। কিন্তু সহজে এই সমস্যা সমাধানের কোন আলামত মিলছে না। ১ আগস্ট থেকে কিছুটা উন্নতির কথা বললেও ১১ আগষ্ট পর্যন্ত গ্যাসের নিম্নচাপ স্বাভাবিক হচ্ছে না।এমনটাই জানিয়েছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস বিতরণের দায়িত্বে থাকা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (কেজিডিসিএল) লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ) মো. রফিক খান। তিনি বলেন, মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকান্ড ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে।এতে বড় ধাক্কা লেগেছে আমদানিকৃত এলএনজি নির্ভর চট্টগ্রামে। দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২২৫ থেকে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট। যা প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ কম।এর ফলে নগরীর শিল্প, বিদ্যুৎ, সার কারখানা, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে আবাসিক খাত পর্যন্ত সর্বত্র গ্যাসের সংকট চলছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। গ্যাসের অভাবকে পুঁজি করে সিএনজিচালিত টেক্সি ভাড়া ইচ্ছেমতো হাঁকা হচ্ছে।নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রান্নার চুলায়ও গ্যাসের চাপ কমে গেছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে রপ্তানিমুখী শিল্প, উৎপাদন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।মো. রফিক খান বলেন, গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) বন্ধ রয়েছে। কেবল কাফকোতে সার উৎপাদন চলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় কাটছাঁট করা হয়েছে। বর্তমানে শুধু শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সীমিত আকারে উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। এই কেন্দ্রে দৈনিক ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়ছে। চট্টগ্রামে বিদ্যুতের লোডশেডিং বিরক্তিকর পর্যায়ে ঠেকেছে।কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ ও সার খাতের জন্য গ্যাস বরাদ্দ দেওয়ার পর অবশিষ্ট প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিয়ে শিল্প, বাণিজ্যিক, আবাসিক এবং সিএনজি সব খাতের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এত অল্প গ্যাস দিয়ে পুরো নেটওয়ার্কে চাপ ধরে রাখা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে দূরবর্তী এলাকা তো বটেই, নগরীর কেন্দ্রীয় এলাকাতেও গ্যাসের চাপ কমে গেছে।চট্টগ্রামের একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় বয়লার স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে স্টিল, রি-রোলিং, কাচ, সিরামিক, টেক্সটাইল, ¯িপনিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিভিন্ন মাঝারি শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। রপ্তানিমুখী শিল্পে সময়মতো উৎপাদন শেষ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতেও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। অনেক স্টেশন পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। এর প্রভাব ইতোমধ্যে গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন এবং নগরজীবনে পড়তে শুরু করেছে। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। গ্যাস সংকটের কারণে ইতোমধ্যে টেক্সিগুলো যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করছে।কেজিডিসিএলের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, ভাসমান টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা কম। বরং জাতীয় চাহিদা বিবেচনায় অন্য অঞ্চলে সরবরাহ বাড়াতে হলে চট্টগ্রামে আরো কাটছাঁট করতে হতে পারে। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় গ্যাস সরবরাহ অগ্রাধিকার দিতে হলে চট্টগ্রামের শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করবে।ওই কর্মকতা বলেন, স্বাভাবিক অবস্থায়ও চট্টগ্রামের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে ২৭০-২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। সংকট শুরুর আগেও চট্টগ্রামে ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেয়া হচ্ছিল। বর্তমানে আরো কমিয়ে ২২৫-২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট করা হয়েছে। বুধবার থেকে সরবরাহ ২৮ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে। ফলে বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উল্লেখযোগ্য উৎপাদন না বাড়লে এবং এলএনজি আমদানি ও রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা আরো সম্প্রসারণ না করলে গ্যাস সংকট সহজে কাটবে না। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমছে। সেই ঘাটতি পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লেও এলএনজির উচ্চমূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মহেশখালীর একটি টার্মিনালে সাময়িক দুর্ঘটনা যে পুরো দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিতে পারে, বর্তমান পরিস্থিতি তারই উদাহরণ।শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের রাজধানীতেও প্রভাব পড়েছে গ্যাস সংকটের। তিতাসের আওতাধীন রাজধানীতে প্রতিদিন ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ পাচ্ছে। এ কারণে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। গ্যাসের চাপ না থাকায় বাসা বাড়িতে রান্নায় বিঘ্ন ঘটছে। কোথাও কোথাও একেবারেই চাপ কম থাকায় বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে নগরবাসীকে।তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি বলছে, তিতাসের আওতায় দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ১৫৫ কোটি ঘনফুটের মত। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাধীন রাজধানী ও আশেপাশের জেলায় সব শ্রেণির গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপ বিরাজ করবে।ভোক্তাদের ভাষ্যগ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর গ্যাস পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদা অনুসারে গ্যাস পাচ্ছেন না বিভিন্ন পরিবহন চালক-শ্রমিকরা। আয় সীমিত হয়ে যাওয়ায় পরিবহনে নির্ভর দিন এনে দিন খাওয়া মানুষেরা তলিয়ে যাচ্ছেন চরম আর্থিক সংকটে।বুধবার (২৯ জুলাই) বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগরীর টাইগারপাস এলাকায় ইন্ট্রাকো ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার জন্য লাইনে দাড়িয়ে থাকা সিএনজি অটোরিক্সা চালক মনজুরুল ইসলামের সাথে গ্যাস নিয়ে কথা বলতেই হাতে চোখের জল চেপে ধরেন তিনি।তিনি বলেন, গত কয়েক দিন ধরে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় ৫-৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও গ্যাস ছাড়াই ফিরে যেতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি দৈনিক আয়ও কমে গেছে। সংসার চলবে কীভাবে সে চিন্তায় হয়তো মরেই যাব। তিনি গ্যাস সংকট দ্রুত নিরসনের দাবি জানান।রাইড শেয়ারিংয়ে ভাড়ায় কার চালান বহদ্দারহাট এলাকার নাছির উদ্দিন। এক সপ্তাহ ধরে গ্যাস সংকটে নাকাল নাছির উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামে অনেক পাম্প, কিন্তু বেশিরভাগই বন্ধ। যেগুলোতে আছে, চাপ খুব কম। সে কারণে সিলিন্ডারের অর্ধেক পরিমাণও গ্যাস ঢুকছে না।হালিশহর এলাকার নাজমা বলেন, গত একসপ্তাহ ধরে চুলাই গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে, কোনো রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। রাত নয়টার পর গ্যাস এলেও শুধু ভাত রান্না করতেই প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগছে। অন্য কোনো রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না।ডবলমুরিং থানার মনসুরাবাদের গৃহিণী সাইরা বেগম বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে বাজার থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এভাবে আর কত দিন চলা যায়?এদিকে রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছেন বলে জানা গেছে। প্রায় ২০ দিন ধরে সেখানে গ্যাস-সংকটে আছেন তাঁরা। বাসাবাড়িতে কেউ কেউ বিদ্যুৎ-চালিত চুলা কিনে রান্নাবান্নার কাজ সারছেন। নিম্ন আয়ের মানুষ মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্না করছেন বলে জানাচ্ছেন তারা।এছাড়া ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা ও বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায়ও দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকছে না। কোথাও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকছে যে, রান্না করাই সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার ও এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছে। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন পরদিনের জন্য রান্না সেরে রাখছেন।ভোগান্তির চিত্র রাজধানীর গ্যাস পাম্পগুলোতেও। ফিলিং স্টেশনের বাইরে যানবাহনের লম্বা সারি। তিন থেকে চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না চালক-শ্রমিকরা। কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ভাড়ায় চালিত গাড়ি চালকরা। ফলে পুরো পরিবহনখাতই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।গ্যাস সংকটে ঢাকার রাস্তায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল কমে গেছে, বেড়ে গেছে ভাড়া। আবদুস সামাদ নামে এক চালক বলেন, আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগতেছে পাম্পেই। তাও যে গ্যাস ঢুকে, তাতে আধা বেলা গাড়ি চালান যাচ্ছে না। এজন্য ড্রাইভাররা গাড়িই বাইর করতেছে না। খাব কি? ভাড়া তো বেশি চাওয়া লাগবেই।ভুক্তভোগীরা বলছেন, দুই-তিন মাস আগেও জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এমন তামাশা করা হয়েছিল। পরে সেই তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এখন কৃত্রিমভাবে গ্যাস সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর কোনো অপচেষ্টা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর বলেন, লাইনে আমাদের দেওয়ার কথা ১৫ পিএসআই (পাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চ) চাপের গ্যাস। সেখানে আমাদের তিন থেকে পাঁচ পিএসআই পর্যন্ত দেওয়া হয়।তিনি বলেন, লাইনে ১৫ পিএসআই চাপের গ্যাস থাকলে আমাদের মেশিনগুলো ঘণ্টায় ৫০০ কিউবিক মিটার গ্যাস কমপ্রেস করতে পারে। আর আমরা গাড়িতে গ্যাস ডেলিভারি দেই তিন হাজার পিএসআই প্রেশারে। ইনপুটে পিএসআই যত কমবে, আউটপুটও তত কম আসবে।ব্যবসায়ীদের ভাষ্যচট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, কারখানায় ৭৫ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে সমস্যা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রয়াদেশের পণ্য সরবরাহ করতে না পারার ঝুঁকিও আছে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাতিল হতে পারে।তিনি বলেন, চট্টগ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে অর্ধ লাখ শিল্প-কারখানা রয়েছে, যার বড় অংশ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন প্রায় ৬০-৭০ লাখ শ্রমিক। এক সপ্তাহ ধরে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কমিয়েছে, কোথাও শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।কবির ষ্টিলের পরিচালক তানজির হোসেন বলেন, তিন থেকে চার পিএসআই গ্যাস সরবরাহ থাকলে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ উৎপাদন চালানো সম্ভব হয়। কিন্তু বর্তমানে গ্যাসের চাপ এত কম যে শ্রমিক ও অপারেটরদের অধিকাংশ সময় বসে থাকতে হচ্ছে। উৎপাদন কমেছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত।বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পরিচালক খোরশেদ আলম বলেন, সব মিলকারখানা বন্ধ প্রায়। কোনো কোনো এলাকায় গ্যাসের সঙ্গে বিদ্যুৎও নেই। কত দিন থাকবে না, সেটা সরকার ঘোষণা দিতে পারে। তাহলে শ্রমিকদের বসিয়ে না রেখে ছুটি দেওয়া যায়।মেরামতের আশাপেট্রোবাংলা এবং রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কো¤পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিদেশি বিশেষজ্ঞ দল স্থানীয় কারিগরি দলের সাথে মিলে এর মেরামত কাজ শুরু করেছে। টার্মিনালের দুটি বয়লারের মধ্যে আগুনে একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অক্ষত বয়লারটি ৪-৫ দিনের মধ্যে চালু করা সম্ভব হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক আরও প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যাবে। তাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়বে। তবে টার্মিনালটি পুরোপুরি মেরামত হয়ে সচল না হওয়া পর্যন্ত এবং জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বাসাবাড়ি, সিএনজি স্টেশন ও শিল্প-কারখানার এই সংকট স¤পূর্ণ কাটবে না। এতে আরও কিছুটা সময় লেগে যেতে পারে।সূত্র মতে, এই দুর্ঘটনার কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন (৪৫ কোটি) ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। গ্যাসের অভাবে চট্টগ্রাম ও ঢাকার সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া ও মানিকগঞ্জের প্রায় ২০০টিরও বেশি টেক্সটাইল, স্টিল ও সিরামিক কারখানার উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ ১,০০০ মিলিয়ন থেকে কমিয়ে ৭০০ মিলিয়নে নামানো হয়েছে, যার ফলে দেশজুড়ে লোডশেডিং বাড়ছে।একই সঙ্গে ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, বাড্ডা ও খিলগাঁওসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় দিনের বেলা রান্নার গ্যাস থাকছে না। সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ ১-২ পিএসআই-এ নেমে আসায় যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে এবং অনেক স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে।এ প্রসঙ্গে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড-এর উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ কবির বলেন, দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল চালু রয়েছে। সাধারণত এসব টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হতো। তবে আকস্মিক কারিগরি ত্রুটির কারণে বর্তমানে সরবরাহ কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। ত্রুটি সারানোর কাজ চলমান আছে। আশা করছি শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।তবে ভিন্নমত পোষণ করেছেন মহেশখালী এলএনজি টার্মিনাল সংশ্লিষ্ট অনেকই। তাদের ভাষ্য, মহেশখালীতে স্থাপিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি এবং অপরটি পরিচালনা করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সামিট এলএনজি টার্মিনাল কোম্পানি। এক সপ্তাহ আগে এক্সিলারেট পরিচালিত টার্মিনালের একটি বয়লারে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এরপর পুরো টার্মিনালটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট রিগ্যাসিফায়েড এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের চেষ্টা করেও সফল হননি। বিদেশ থেকে প্রকৌশলী এনেও চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কাজ হয়নি। কবে নাগাদ টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, টার্মিনালটিতে দুটি বয়লার রয়েছে। আগুনে একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যটি সচল করা গেলে অন্তত ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। প্রকৌশলীরা সেটি চালুর চেষ্টা করছেন। আগামী ১ আগস্ট নাগাদ ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি ঠিক হতে পারে। বিদেশ থেকে বেশ কিছু যন্ত্রপাতি আনা হচ্ছে। ওগুলো লাগানো হলে একটি বয়লার চালু করে অন্তত ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে টার্মিনালটি। তবে টার্মিনালটি পুরোপুরি কার্যকর হতে আগামী ১১ আগস্ট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে ১১ আগস্টের আগে চট্টগ্রামসহ দেশে গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ আসার সুযোগ নেই।বিশেষজ্ঞদের মতামতবিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গ্যাস খাত দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিতে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উত্তাল সমুদ্র বা যেকোনো দুর্ঘটনায় টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হতে পারে। অতীতে একাধিকবার এমন ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হয়ে সামিটের টার্মিনালটি ২০২৪ সালে সাড়ে তিন মাস গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেছিল। আর একটি টার্মিনাল স্থলভাগে করা হলে এখনকার পরিস্থিতি এড়ানো যেত।এ ছাড়া যেকোনো সময় আমদানি ব্যাহত হতে পারে। বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০২২ সালের জুলাই থেকে টানা ৭ মাস খোলাবাজারে এলএনজি কেনেনি সরকার। আমদানি নির্ভরতার এ ঝুঁকি থাকবেই।বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল ইলাহী চৌধুরী বলেন, গত আড়াই দশকের অবহেলায় আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিদেশ নির্ভর হয়ে জ্বালানি খাত চলবে না। গ্যাস অনুসন্ধানে অনেক কম কূপ খনন করে বেশি সফলতার পরও অবহেলা করা হয়েছে। সারা দেশে গ্যাসের অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। এ ছাড়া দ্রুত কূপ সংস্কার করে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে হবে।উল্লেখ্য, দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় এবং এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতির চাপ সামাল দিতে বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ কমানো হচ্ছে। তবে চট্টগ্রাম যেহেতু নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনের গ্যাস দেওয়া হয় না, পুরোপুরি এলএনজি নির্ভর, তাই এখানকার সংকট তুলনামূলকভাবে বেশি।
২ মাস ৯ দিন আগে
মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লেগে কারিগরি সমস্যার কারণে বন্ধ রয়েছে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ। এতে পরিবহন খাত থেকে শিল্প কারখানা, এমনকি রান্নাবান্নায়ও প্রভাব পড়েছে। গৃহিণীদের নির্ভর করতে হচ্ছে ইলেকক্ট্রিক চুলার উপর। ফলে সরকারি গ্যাস সংযোগ খরচের পাশাপাশি তাদের গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। অন্যদিকে গ্যাস পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদা অনুসারে গ্যাস পাচ্ছেন না বিভিন্ন পরিবহন চালক-শ্রমিকরা। আয় সীমিত হয়ে যাওয়ায় পরিবহনে নির্ভর করে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষেরা তলিয়ে যাচ্ছেন চরম আর্থিক সংকটে। গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলছে তীব্র গ্যাস সংকট। চলছে হাহাকার। চলমান গ্যাস সংকটে দিন যতই গড়াচ্ছে ততই বাড়ছে ভোগান্তি। জীবনযাত্রা প্রায় অচল হয়ে যাচ্ছে। ফলে যেকোনো মূল্যে দ্রুত এর সমাধান চান সবাই। তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, কৃত্রিমভাবে গ্যাস সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর কোনো অপচেষ্টা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে সরকারকে।তবে সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাস সংকটের কারণ হিসেবে কক্সবাজারের মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কথা বলা হচ্ছে। তাতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট কমে গেছে। তিতাসের আওতাধীন এলাকায় দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ১৫৫ কোটি ঘনফুটের মত। সে কারণে পাম্পে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ থাকছে না।তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি বলছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাধীন রাজধানী ও আশেপাশের জেলায় সব শ্রেণির গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপ বিরাজ করবে।গ্যাসের চাপ না থাকায় বাসা বাড়িতেও রান্নায় বিঘ্ন ঘটছে। কোথাও কোথাও একেবারেই চাপ কম থাকায় বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে নগরবাসীকে। ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছেন মোহাম্মদপুরের মানুষ। প্রায় ২০ দিন ধরে গ্যাস-সংকটে আছেন তাঁরা। শুরুতে জলাবদ্ধতার কারণে পাইপলাইনে পানি ঢুকে গ্যাস বন্ধ হয়ে যায় বেশ কিছু আবাসিক এলাকায়। শেখেরটেক এলাকায় এখনো এই সমস্যা কাটেনি। এর মধ্যে গ্যাসের সরবরাহ কমায় অন্যান্য এলাকাতেও গ্যাসের চাপ কমে গেছে। বাসাবাড়িতে কেউ কেউ বিদ্যুৎ-চালিত চুলা কিনছেন। আর নিম্ন আয়ের মানুষ মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্নার চেষ্টা করছেন। ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা ও বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায়ও দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকছে না। কোথাও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকছে যে, রান্না করাই সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার ও এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছে। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন পরদিনের জন্য রান্না সেরে রাখছেন।মনসুরাবাদের গৃহিণী সাইরা বেগম বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে বাজার থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এভাবে আর কত দিন চলা যায়? মালিবাগের আফওয়া নাজমা বলেন, সকাল থেকে গ্যাসের চাপ এতটাই কম ছিল যে, কোনো রান্না করা সম্ভব হয়নি। রাত নয়টার পর গ্যাস এলেও শুধু ভাত রান্না করতেই প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগেছে। অন্য কোনো রান্না করা সম্ভব হয়নি। কাঁঠালবাগানের সুফিয়া জান্নাত বলেন, দুপুরে প্রায় এক ঘণ্টা চুলায় কড়াই বসিয়ে রেখেও তেল গরম করা যায়নি। ছোট শিশুর জন্য সময়মতো খাবার তৈরি করতে না পেরে প্রতিদিন বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে।চলমান গ্যাস সংকটে ভোগান্তির চিত্র রাজধানীর গ্যাস পাম্পগুলোতেও। ফিলিং স্টেশনের বাইরে যানবাহনের লম্বা সারি। তিন থেকে চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না চালক-শ্রমিকরা। কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ভাড়ায় চালিত গাড়ি চালকরা। ফলে পুরো পরিবহনখাতই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন পাম্পগুলোও। দ্রুত সমাধানের আকুতি পাম্প শ্রমিকদেরও। তবে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, এলএনজি সরবরাহ নির্বিঘ্ন হলে এ সংকট কেটে যাবে।গত সোমবার ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকটি পাম্পে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় গ্যাস বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। যেগুলো খোলা আছে, সেগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদা মোতাবেক গ্যাস পাচ্ছেন না সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালকরা। পাম্পগুলো থেকে মাত্র ২০০ টাকার গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন এভাবে দিনের অর্ধেক সময় অলস ব্যয় করে গাড়ির জমা ও পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। টানা এই সংকটে ক্রমান্বয়ে ভোগান্তি বাড়ছে যানবাহন নির্ভর অন্য কর্মজীবীরাও। তারা বলেন, গ্যাসের জন্য পাম্পের বাইরে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে তাদের। তবুও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না তারা। এতে ফের এসে গ্যাসের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকরা বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় আয় রোজগারে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে তাদের। গ্যাসের অভাবে ভাড়ার গাড়ি চালাতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা।পাম্পের কর্মচারীরাও বলেন, চাহিদা অনুসারে গ্যাস দেয়ার মতো মজুদ নেই তাদের কাছে। তবে স্বল্প পরিমাণে সারাদিনই গ্যাস সরবরাহ করতে পারবেন তারা। আর কর্তৃপক্ষ বলছে, সরবরাহ কমে আসায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। আর্থিক ক্ষতি এড়াতে পাম্প বন্ধও রাখতে হচ্ছে। তবে সরবরাহ বাড়লে এ সংকট কেটে যাবে। একজন পাম্প কর্মচারি বলেন, যুদ্ধের কারণে বাইরে থেকে এলএনজি খুব একটা আসছে না। আর বর্তমানে বৈশ্বিক বৈষম্যের কারণে একটু কম আনা হচ্ছে। যার জন্য হয়তো প্রেশারটা একটু কম পাচ্ছে। যদি এলএনজি ঠিকমতো আসতে পারে, তাহলে আপনার প্রেশার ঠিকমতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে, আশা রাখি।’রাইড শেয়ারিংয়ে ভাড়ায় গাড়ি চালান গাবতলী এলাকার নাছির উদ্দিন। তিনদিন ধরে গ্যাস সংকটে নাকাল নাছির উদ্দিন বলেন, গাবতলীতে অনেক পাম্প, কিন্তু বেশিরভাগই বন্ধ। তার ভাষ্য, শুধু গাবতলীই নয়, বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশনে ‘গ্যাস নেই’। যেগুলোতে আছে, চাপ খুব কম। সে কারণে সিলিন্ডারের অর্ধেক পরিমাণও গ্যাাস ঢুকছে না।তিনি বলেন, ‘সাভার এলাকার পাম্পগুলাও সব বন্ধ। আজকে একটা ট্রিপ নিয়ে গেছিলাম ডেমরা। স্টাফ কোয়ার্টারে (পাম্পে) লাইনে দিয়া দাঁড়াইতে গেলাম। দেখি বিশাল সিরিয়াল। কিছুক্ষণ পর পাম্প এমনিই বন্ধ হবে। বাধ্য হয়ে খালি ট্যাংক নিয়াই এখন বাসার দিকে রওনা দিছি।’কল্যাণপুরের হাফিজা সিএনজি পাম্পের কর্মী ফিরোজ বলেন, ‘সারাদিন কমপ্রেশর মেশিন চালাইয়াও প্রেশার উঠতাছে না। লাইনে গ্যাসই নাই।’এদিকে গ্যাস সংকটে ঢাকার রাস্তায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল কমে গেছে, বেড়ে গেছে ভাড়া। চালক জহির মোল্লা বলেন, ‘আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগতেছে পাম্পেই। তাও যে গ্যাস ঢুকে, তাতে আধা বেলা গাড়ি চালান যাচ্ছে না। এজন্য ড্রাইভাররা গাড়িই বাইর করতেছে না।’ বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর বলেন, লাইনে আমাদের দেওয়ার কথা ১৫ পিএসআই (পাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চ) চাপের গ্যাস। সেখানে আমাদের তিন থেকে পাঁচ পিএসআই পর্যন্ত দেওয়া হয়। ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় আমরা কখনো ১০ থেকে ১১ পিএসআই চাপের গ্যাস পাই। এখন গ্যাস একেবারেই জিরো বলা যায়।’ তিনি বলেন, ‘লাইনে ১৫ পিএসআই চাপের গ্যাস থাকলে আমাদের মেশিনগুলো ঘণ্টায় ৫০০ কিউবিক মিটার গ্যাস কমপ্রেস করতে পারে। আর আমরা গাড়িতে গ্যাস ডেলিভারি দেই তিন হাজার পিএসআই প্রেশারে। ইনপুটে পিএসআই যত কমবে, আউটপুটও তত কম আসবে।নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি রাশিদুল হাসান বলেন, কারখানায় ৭৫ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে সমস্যা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রয়াদেশের পণ্য সরবরাহ করতে না পারার ঝুঁকিও আছে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাতিল হতে পারে। গাজীপুরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে, যার বড় অংশ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক। এক সপ্তাহ ধরে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কমিয়েছে, কোথাও শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।গাজীপুরের সাদমা গ্রুপের পরিচালক সোহেল রানা বলেন, তিন থেকে চার পিএসআই গ্যাস সরবরাহ থাকলে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ উৎপাদন চালানো সম্ভব হয়। কিন্তু বর্তমানে গ্যাসের চাপ এত কম যে শ্রমিক ও অপারেটরদের অধিকাংশ সময় বসে থাকতে হচ্ছে।উৎপাদন কমেছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পরিচালক খোরশেদ আলম বলেন, সব মিলকারখানা বন্ধ প্রায়। কোনো কোনো এলাকায় গ্যাসের সঙ্গে বিদ্যুৎও নেই। কত দিন থাকবে না, সেটা সরকার ঘোষণা দিতে পারে। তাহলে শ্রমিকদের বসিয়ে না রেখে ছুটি দেওয়া যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের গ্যাস খাত দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিতে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উত্তাল সমুদ্র বা যেকোনো দুর্ঘটনায় টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হতে পারে। অতীতে একাধিকবার এমন ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হয়ে সামিটের টার্মিনালটি ২০২৪ সালে সাড়ে তিন মাস গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেছিল। আর একটি টার্মিনাল স্থলভাগে করা হলে এখনকার পরিস্থিতি এড়ানো যেত। এ ছাড়া যেকোনো সময় আমদানি ব্যাহত হতে পারে। বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০২২ সালের জুলাই থেকে টানা ৭ মাস খোলাবাজারে এলএনজি কেনেনি সরকার। আমদানিনির্ভরতার এ ঝুঁকি থাকবেই।বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল ইলাহী চৌধুরী বলেন, গত আড়াই দশকের অবহেলায় আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিদেশনির্ভর হয়ে জ্বালানি খাত চলবে না। গ্যাস অনুসন্ধানে অনেক কম কূপ খনন করে বেশি সফলতার পরও অবহেলা করা হয়েছে। সারা দেশে গ্যাসের অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। এ ছাড়া দ্রুত কূপ সংস্কার করে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে হবে।
২ মাস ১১ দিন আগে