চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) বা চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের যাত্রা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই প্রকল্প চালু হলে অবকাঠামোসহ সব মিলিয়ে এখানে ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ আসবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।সোমবার (২৭ জুলাই) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর এলাকায় এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশেষ এই অঞ্চলের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তরের ফলক উন্মোচন করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ।ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আজ এখানে যে বিনিয়োগের সূচনা হলো, তা ২০৩৪ সালের মধ্যে আমাদের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর যে লক্ষ্য, তার দিকে একটি বড় পদক্ষেপ। সরকারের পক্ষ থেকে আমরা যে এক কোটি কর্মসংস্থানের কথা বলেছি, এটি তারই অংশ।অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে এখানে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা বলা হলেও, অবকাঠামোগত সবকিছু হিসাব করলে মোট বিনিয়োগ ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এর অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু আনোয়ারায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, পুরো অঞ্চলের সাপ্লাই চেইন ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। এখানে ১ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে।অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কাক্সিক্ষত উন্নতি না করলে কোনোভাবেই নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান শর্তই হলো স্থিতিশীল পরিবেশ ও নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে কাজ করছে।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যেকোনো দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের মূল ভিত্তি হলো শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি খাটাতে চান নিরাপদ ও অনুক‚ল পরিবেশে। যদি জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে সামান্যতম শঙ্কাও থাকে, তবে বিদেশি বিনিয়োগ তো দূরের কথা, দেশীয় উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগে এগোবেন না।বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করে মন্ত্রী বলেন, সিইআইজেডসহ দেশের সবকটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শিল্পাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অত্যন্ত তৎপর রয়েছে। কোনো ধরনের অপতৎপরতা বরদাশত করা হবে না।অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের চেয়ারম্যান ওয়াং বেংকিয়ান। এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন চীনা সড়ক এবং সেতু করপোরেশনের (সিআরবিসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট লি চাংগুই ও চীনা রাষ্ট্রদূত এইচ ই ইয়াও ইয়েন। তারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রশংসা করেন এবং এই প্রকল্প দ্রæত বাস্তবায়নে যৌথ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, ভ‚মি ও পার্বত্যবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মো. হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামসহ চট্টগ্রামের স্থানীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি ও ক‚টনৈতিক কর্মকর্তারা।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, আনোয়ারায় এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি পুরোপুরি চালু হলে দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে। সেই সঙ্গে স্থানীয় স্তরে লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। প্রায় এক দশকের বেশি সময় স্থবির হয়ে থাকার পর এই চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের (সিইআইজেড) যাত্রা শুরু হলো আনোয়ারায়। যা দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগভিত্তিক শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।বেজার তথ্যমতে, ২০১৪ সালে এ প্রকল্প নিয়ে সমঝোতা স্মারক সই করে বাংলাদেশ ও চীন। জমি অধিগ্রহণ স¤পন্ন হয় ২০১৬ সালে। তবে ডেভেলপার নিয়োগ, অর্থায়ন চ‚ড়ান্তকরণ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়নি।গত ২২ থেকে ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর প্রকল্পটিতে নতুন গতি আসে। সফরে দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৫ জুন বেজা ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চলটির ডেভেলপার চুক্তি হয়।এর আগে গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় আনোয়ারার বেলচ‚ড়া এলাকায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠবে এ অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল।চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হকের ভাষ্য, চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে শিল্পায়নের যে স্বপ্ন দীর্ঘদিন ধরে লালিত হয়ে আসছিল, এবার তা বাস্তবে রূপ নিল। প্রতীক্ষিত বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অঞ্চল (চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন)-এর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সূচিত হলো সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।তিনি আরও বলেন, কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে আনোয়ারা এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম কৌশলগত শিল্প হাব হওয়ার পথে। প্রকল্পটি কেবল একটি শিল্পাঞ্চল নয়, এটি এই অঞ্চলের কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং জীবনযাত্রার মান বদলে দেওয়ার চাবিকাঠি।
২ মাস ১২ দিন আগে
জুলাই মাস থেকে কার্যকর হচ্ছে নতুন সরকারি পে-স্কেল। এ নিয়ে দারুণ স্বস্তিতে সরকারি চাকুরিজীবীরা। অন্যদিকে চরম অস্বস্তিতে রয়েছেন বেসরকারি বিভিন্ন খাতের চাকুরিজীবীরা। কারণ তাদের বেতন-ভাতা নতুন পে-স্কেলে বাড়ছে না। ফলে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বেসরকারি চাকুরিজীবীরা।যাদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়, বেসরকারি খাতের শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ছয় কোটি ৯৭ লাখ। অর্থাৎ মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৯৫ শতাংশই বেসরকারি খাতে কাজ করছে। আর সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা সাড়ে ১৪ লাখের কিছু বেশি। নতুন পে-স্কেলের আওতায় মূলত তাদেরই বেতন-ভাতা বাড়তে যাচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দুই অংশের মধ্যে একটা বৈষম্য তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বা গুঞ্জন নিয়ে অর্থনীতিবিদ এবং বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ।তারা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হলে তা দেশের সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতিকে আরো উসকে দিতে পারে। এর ফলে সাধারণ এবং নিম্ন-আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি খাতের কর্মচারীদের বেতন বাড়লে বাজারে দুটি বড় প্রভাব পড়ে। চাহিদা বৃদ্ধি অর্থাৎ একসাথে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর হাতে অতিরিক্ত টাকা আসায় বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যায়। সরবরাহ যদি সেই অনুপাতে না বাড়ে, তবে স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের দাম বাড়ে। মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়ে। কেননা, বাজারে কেবল বেতন বৃদ্ধির খবর ছড়ালেই একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, পরিবহন ভাড়া এবং বাসাভাড়া বাড়িয়ে দেন। যার ভুক্তভোগী হন বেসরকারি খাতের কর্মীসহ দেশের সব সাধারণ নাগরিক। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মুদ্রাস্ফীতি যখন এমনিতেই ঊর্ধ্বমুখী, তখন বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ানো জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালার মতো। সরকারি চাকরিজীবীদের সুরক্ষা দিতে গিয়ে যদি বেতন বাড়ানো হয়, তবে তার খেসারত দিতে হবে দেশের সিংহভাগ বেসরকারি চাকরিজীবী, দিনমজুর এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে, যাদের আয় বাড়েনি।পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের কর্মসংস্থানের মাত্র একটি ছোট অংশ সরকারি খাতের আওতাভুক্ত। বাকি বিশাল জনগোষ্ঠী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, অনানুষ্ঠানিক খাত বা আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বাজারদরের যে ঊর্ধ্বগতি হবে, তা সামাল দেওয়ার মতো কোনো অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর থাকবে না। ফলে ধনী-গরিবের ব্যবধান আরো প্রকট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাসিন্দা তৌহিদ আসলাম। চাকরি করেন ইপিজেড এলাকার িএকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। সেখানে যত টাকা বেতন পান, উচ্চমূল্যের বাজারে সেটি দিয়ে বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তানসহ ৭ জনের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান। এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর খবর তাকে রীতিমতো দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। তৌহিদ আসলাম বলেন, বাজারে জিনিসপত্রের যে দাম, তাতে বাজারে গেলে ঘাম ছুটে যায়। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সাথে সাথে সেগুলোর দাম আবারও বেড়ে যাবে। আমাদের মতো মানুষের আয় তো বাড়ছে না। তাহলে আমরা বাঁচব কিভাবে?’ তার এই উদ্বেগ যে মোটেও অমূলক নয়, অর্থনীতিবিদদের কথাতেও সেটির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তারা বলছেন, সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারির বেতন বৃদ্ধি ফলে কেবল মূল্যস্ফীতিই বাড়বে না, সেইসঙ্গে বৈষম্য, দারিদ্র্য, তারল্য সংকটসহ আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে নানা ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে। সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যে ধরনের পরিকল্পনা ও পূর্বপ্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন, সরকার সেদিকে দৃষ্টি না দিলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট আরো বেড়ে যেতে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আয়ের বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। সেইসঙ্গে বাড়ছে দারিদ্র্যের হার। বিশ্বব্যাংকের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক সাত শতাংশ, ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সরকারির পাশাপাশি বেসরকারিখাতের কর্মজীবীদের বেতন-ভাতা না বাড়লে আয় বৈষম্য আরো বেড়ে যেতে পারে, যার ফলে দেশে দারিদ্র্যের হারও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে মনে করছেন তারা। গত কয়েক বছর ধরেই দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার উচ্চ। গত জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার আগের মাসের চেয়ে কিছুটা কমলেও এখনো সেটি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এর মধ্যে নতুন পে-স্কেল ঘোষণা মুদ্রাস্ফীতিকে আরো উসকে দেবে- এমনটাই বলছেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, নতুন পে-স্কেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে গিয়ে যে বাড়তি বেতনের অর্থের প্রয়োজন হবে, সেটির জন্য সরকারকে ঋণ নিতে হবে বা নতুন করে টাকা ছাপাতে হবে। বাড়তি ওই টাকা অর্থনীতিতে যোগ হলেই সার্বিক মুদ্রাস্ফীতি আরো বেড়ে যাবে। তখন সেটা সামাল দেওয়া সরকারের জন্য আরো চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াবে বলে জানান সেলিম রায়হান।প্রতি পাঁচ বছর পরপর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা পর্যালোচনার বিধান থাকলেও গত দশ বছরে একবারও সেটি করা হয়নি। ফলে নতুন পে-স্কেল ঘোষণার উদ্যোগকে যৌক্তিক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে, গত এক দশকে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচ-খরচা যেভাবে বেড়েছে, সেই বিবেচনায় নতুন পে-স্কেল ঘোষণার এই উদ্যোগ অত্যন্ত যৌক্তিক, বলছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর। কিন্তু উদ্যোগটি এমন একটি সময় নেওয়া হয়েছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক হলেও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে সেটি কী ধরনের প্রভাব ফেলবে বা নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে কি-না, সেই প্রশ্নটি সামনে চলে আসছে বলেন অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর।অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেড়ে যাওয়ার ফলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যাবে। এর ফলে আগের চেয়ে বেশি কেনাকাটা করার কারণে বাজারে পণ্যের চাহিদাও বেড়ে যাবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জিনিসপত্রের দামও বেড়ে যেতে পারে। তবে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ঠিক রেখে পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশের অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, চাহিদা বাড়লেই বরং ব্যবসায়ীদের একটি অংশ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম কয়েকগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। ফলে নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এক্ষেত্রে সরকার যদি নিত্যপণ্যের সংকট বা লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে ভোগান্তি থেকে তাদের ওপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ তৈরি হতে পারে বলে জানান তিনি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হিসেবে, বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন পদে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা সাড়ে ১৪ লাখের কিছু বেশি। নতুন পে-স্কেলের আওতায় মূলত তাদেরই বেতন-ভাতা বাড়তে যাচ্ছে। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ছয় কোটি ৯৭ লাখ। অর্থাৎ মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৯৫ শতাংশই বেসরকারি খাতে কাজ করছে, অথচ সরকারি চাকরিজীবীদের সঙ্গে তাদের বেতন-ভাতা বাড়ছে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দুই অংশের মধ্যে একটা বৈষম্য তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্রাচুইটিসহ যা এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। বাজেটের 'জনপ্রশাসন-নিট' খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত অর্থের অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে মূলত সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য। কিন্তু বাড়তি এই ব্যয়ের বিপরীতে সরকার আয় তো সেভাবে বাড়ছে না, বরং নতুন বাজেটে যে বিপুল আর্থের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, সেটা মেটাতেই সরকারকে দেশে-বিদেশে ঋণের দিকে ঝুঁকতে হবে। এক্ষেত্রে বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে হলে অর্থনীতি বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। আবার দেশি ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিলে সেখানে তারল্য সংকট দেখা দিবে, সেটাও আরেক সমস্যা বলে জানান তারা। দেশে চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন যে চ্যালেঞ্জিং হবে, বিএনপি সরকারও সেটা স্বীকার করছে। তারপরও ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই তারা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করতে চান বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। ইশতেহারে বলা হয়েছে যে যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা হবে এবং সেই অনুযায়ীই একটা রিভিউ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বেতন-ভাতা একবারে না বাড়িয়ে সেটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রথমেই বেতন বা বেসিকটা বাড়ানো হবে বলে জানান উপদেষ্টা তিতুমীর।তার আগে, গত জুনে সংসদে দেওয়া বাজেট বক্তব্যে নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল কয়েক ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। সরকারি কর্মচারীরা বিগত প্রায় ১১ বছর যাবৎ একই বেতন কাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আগামী পহেলা জুলাই ২০২৬ হতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি বলে বাজেট বক্তৃতায় সংসদে বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষিত হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর প্রতিবছর মূল বেতন পাঁচ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলেও নতুন করে আর পে-স্কেলে ঘোষণা করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। ২০২৫ সালে নতুন একটি বেতন কমিশন গঠন করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিশন বেতন কাঠামো পর্যালোচনা শেষে গত জানুয়ারি মাসে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন। সেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, বিদ্যমান সর্বনিম্ন বেতন স্কেল আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেন কমিশনের সদস্যরা। এছাড়া বৈশাখী ভাতার হার ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার পাশাপাশি যাতায়াত ভাতাও বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করার জন্য অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কমিশন গঠন করে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করলেও সেটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত পরবর্তী সরকারের হাতে ছেড়ে দেন অধ্যাপক ইউনূসের সরকার। গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর আগের কমিশনের পরামর্শগুলো পর্যালোচনা করার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে বিএনপি সরকার। সেই কমিটি ইতোমধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছে, যেখানে ১১ থেকে ২০তম গ্রেড, অর্থাৎ মধ্যম ও নিম্ন পদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি গ্রেডে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য শিগগিরই খসড়া রূপরেখাটি মন্ত্রিসভায় পাঠানোর কথা রয়েছে। অনুমোদন শেষে চলতি মাসেই গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হতে পারে বলে বলেও জানা যাচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে। এক বছরের হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমেছে বলা হলেও বাস্তবে পণ্যের দাম কমেনি; বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে মাত্র। তাঁর মতে, এই প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। তিনি বাজার কাঠামোতে স্বচ্ছতা আনার পাশাপাশি চড়া মূল্যস্ফীতির সময়ে খাদ্য ভর্তুকি ও সুবিধাভোগীর আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ধরনের ব্যয়ের জন্য জনগণ ও অর্থনীতি প্রস্তুত কি না, তা যাচাই জরুরি। সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ না করে পে স্কেল বাস্তবায়ন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাওয়া অর্থনীতি এখনো মজুরি বাড়ানোর মতো সক্ষমতায় পৌঁছায়নি। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়লে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি টেকসই হবে না। বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে অর্থনীতি মন্দার পূর্বমুহূর্তে রয়েছে, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির সুফল পাওয়া কঠিন।
২ মাস ১৮ দিন আগে
আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মীর মোফাজ্জল হোসেনের বিরুদ্ধে পদোন্নতিতে নজিরবিহীন অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি, সরকারি গাড়ি ও সুবিধার চরম অপব্যবহার এবং ব্যাংকের আর্থিক হিসাবে কারসাজির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত শেষ করে তার বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় মামলা দায়ের ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা হয়েছে। লিখিত অভিযোগে মীর মোফাজ্জল হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে দ্বৈত সুবিধা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়েছে। তিনি ব্যাংকের গাড়ি ব্যবহার করার পাশাপাশি সরকারের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালা তোয়াক্কা না করে প্রতি মাসে নগদ ৫০ হাজার টাকা পকেটে ভরছেন। এখানেই শেষ নয়, তিনি একই সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি এবং ব্যাংকের অপর একটি গাড়ি সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়মিত ব্যবহার করছেন। এই দুর্নীতির সত্যতা নিশ্চিত করতে গাড়ির লগবুক, ওভারটাইম বিল এবং জ্বালানি খরচের নথি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।এছাড়া পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় এই এমডির সুনির্দিষ্ট অনিয়মের প্রতিবাদ করায় ব্যাংকের একজন নারী কর্মকর্তাকে চরমভাবে হয়রানি ও হেনস্তা করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংকটির বিগত কয়েক বছরের আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনা করে অভিযোগপত্রে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী: শ্রেণিকৃত (খেলাপি) ঋণ: ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাংকটিতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৩২৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩১ কোটি ২৭ লাখ টাকায়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র কয়েক মাসে তা আশঙ্কাজনকভাবে লাফিয়ে বেড়ে ৪৩৪ কোটি ৮০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে।মুনাফার মারপ্যাঁচ: ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাংকটি ৪৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা নিট লোকসান গুনেছিল। অথচ ঠিক পরের অর্থবছরেই (২০২৪-২৫) রহস্যজনকভাবে মাত্র ২ কোটি টাকা নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই সময়ে যেখানে ব্যাংকের পরিচালনাগত মুনাফা কমেছে এবং খেলাপি ঋণ হু হু করে বেড়েছে, সেখানে নিট মুনাফা দেখানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মূলত হিসাবের খাতায় কারসাজি ও শুভঙ্করের ফাঁকি দিয়ে ব্যাংকের প্রকৃত ভঙ্গুর আর্থিক চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করেছেন এমডি। এছাড়া বিপুল পরিমাণ পুনঃতফসিলকৃত ঋণের হিসাবকে আড়ালে রেখে কাগজ-কলমে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর মাধ্যমে ব্যাংকটিকে চরম আর্থিক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সপক্ষে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, ভিডিও ফুটেজের লিংক এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর নথিও প্রমাণস্বরূপ অভিযোগপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাবেক সরকারের আমলে বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে মীর মোফাজ্জল হোসেন ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি একই পদে বহাল ছিলেন। একইভাবে বর্তমান সরকারের সময়েও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ব্যাংকের পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় মীর মোফাজ্জল হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অনিয়মের অভিযোগটি এরই মধ্যে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি এই জালিয়াতির সত্যতা পেয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয় এখন ওই এমডির বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে।এসব বিষয়ে জানতে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মীর মোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
২ মাস ১৮ দিন আগে
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকর পূরো নিয়ন্ত্রণ ছিল বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের। গ্রুপটির কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদের ভাই আবদুস সামাদ লাবু দীর্ঘ সময় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ওই সময়ে লাবুর নেতৃত্বে কেডিএস গ্রুপের খলিলুর রহমান ও তাঁর ছেলে সেলিম রহমান ব্যাংকটির ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্বতন্ত্র পরিচালকদের দিয়ে পরিচালিত আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে পুনরায় ফিরলেন পুরোনো উদ্যোক্তা-শেয়ারধারীরা। বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ বহাল রেখে পুরোনো উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকে ১৪ জনকে যুক্ত করে নতুন পর্ষদ গঠন করেছে। নতুন যুক্ত হওয়া সদস্যদের অধিকাংশই চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী কেডিএস গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তবে পূরণোদের মধ্যে নেই শুধু এস আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সামাদ লাবু। বুধবার (১৫ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে পাঁচ সদস্যের স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ করেছিল। প্রায় দুই বছর পর ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় আগের উদ্যোক্তাদের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যেসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ আগে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর অনেক উদ্যোক্তাকে এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ায় তাদেরই পর্ষদে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।নতুন পর্ষদে যুক্ত হওয়া ১৪ সদস্যের মধ্যে রয়েছেন কেডিএস গ্রুপের কর্ণধার খলিলুর রহমান, তাঁর বড় ছেলে সেলিম রহমান, ছোট ভাই আহামেদুল হক এবং আহামেদুল হকের সম্বন্ধী বদিউর রহমান। বদিউর রহমান ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন। পরে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জানা যায়, ২০২৩ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।এ ছাড়া কেডিএস গার্মেন্টসের প্রতিনিধি হিসেবে মাহবুব আহমেদ, কেডিএস টেক্সটাইলের প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এবং কেওয়াই স্টিল মিলের প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে শরিফ উদ্দিন তসলিমকে পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পর্ষদে পুনরায় জায়গা পেয়েছেন চট্টগ্রামভিত্তিক মীর গ্রুপের কর্ণধার আবদুস সালাম। তিনি এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদের ছেলের শ্বশুর।এ ছাড়া দুবাইভিত্তিক আল হারামাইন পারফিউমসের মালিক ও এনআরবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মাহতাবুর রহমান নাসিরের ছেলে ইমাদুর রহমানকে আবার পরিচালক করা হয়েছে। পুরোনো পরিচালকদের মধ্যে আরও রয়েছেন রফিকুল ইসলাম, নাজমুল আহসান খালেদ, আনোয়ার হোসাইন, লিয়াকত আলী চৌধুরী ও এনায়েত উল্লাহ।
২ মাস ২৩ দিন আগে
ব্যবসায়িক সাফল্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিয়মিত কর পরিশোধের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরী প্রকাশ ডিসকো শওকত। ধারাবাহিকভাবে গত ১১ বছর তিনি সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে আসছেন। সোমবার (১৩ জুলাই) এক বার্তায় তাঁর ঘনিষ্ঠজনরা এ তথ্য জানান। তারা জানিয়েছেন, শওকত আলী চৌধুরী ব্যবসায় স্বচ্ছতা ও আইনানুগ কার্যক্রম পরিচালনায় দেশে-বিদেশে পরিচালিত তার ব্যবসাগুলোর তথ্য যথাযথভাবে কর নথিতে উল্লেখ রয়েছে এবং সেসব আয়ের বিপরীতে তিনি নিয়ম অনুযায়ী শতভাগ কর পরিশোধ করেছেন।এরপরও একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন করতে বিভিন্ন মাধ্যমে অসত্য, বানোয়াট ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, এসব অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তাদের মতে, বর্তমান সরকার দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কাজ করছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি মো. শওকত আলী চৌধুরী শিপ রিসাইক্লিং, লজিস্টিকস, রিয়েল এস্টেট, চা শিল্প, বীমাসহ বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।তারা আরও জানান, দীর্ঘ সময় ধরে সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন শওকত আলী চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি উত্থাপিত অভিযোগগুলো অসত্য, ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।ব্যাংকিং খাতে তার অবদানও উল্লেখযোগ্য। ইস্টার্ন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। তিনি ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং ১৯৯৩ সাল থেকে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতায় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণ, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং করপোরেট পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন।তার নেতৃত্বে পরিচালনা পর্ষদ করপোরেট গভর্ন্যান্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনেও গ্রাহকের আস্থা অর্জন, সুশাসন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি অগ্রাধিকার পেয়েছে।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইস্টার্ন ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংকিং, অনলাইন সেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভর গ্রাহকসেবা সম্প্রসারণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ২০২৫ সালের বার্ষিক সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডাররা ব্যাংকের ডিজিটাল রূপান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির কৌশলের প্রশংসা করেন।
২ মাস ২৬ দিন আগে
ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও এলপিজির দাম বেড়েছে এপৃলে। জুনে এসে বাড়ল বিদ্যুতের দাম। আবাসিক থেকে কৃষি, শিল্প, হাসপাতাল, মসজিদ-মন্দির—সব ধরনের গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বাড়ার ঘোষণা দিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। যার গড় ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ।গত ৩ জুন বুধবারের ঘোষণা অনুযায়ী, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম ইউনিটপ্রতি ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে হলো ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। বৃদ্ধির গড় ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। পাইকারি দাম বাড়ল আরও বেশি—৭ টাকা থেকে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা। বৃদ্ধি ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। একসাথে বিদ্যুতের এত মূল্যবৃদ্ধি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কার্যকরও হবে ঘোষণার তিন দিন আগে ১ জুন থেকে।কোন গ্রাহকের বিল কতটা বাড়ছেমূল্যবৃদ্ধির হার দেখলেই বোঝা যায়, কোনো ধরণের গ্রাহকই রেহাই পাননি। যিনি সারাদিন মাত্র একটি বাল্ব আর একটি পাখা চালান—তিনিও মাস শেষে প্রায় ৪০ টাকা বেশি বিদ্যুৎ বিল দেবেন। যিনি মাসে ৭৫ ইউনিট ব্যবহার করেন— তিনিও বাড়তি দেবেন প্রায় ৬৯ টাকা। যিনি ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহার করেন—তিনি বাড়তি দিবেন প্রায় ২০০ টাকার বেশি। যিনি ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট ব্যবহার করেন—তিনি দিবেন প্রায় ৪৫০ টাকা বেশি। যিনি ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহার করেন—তিনি দিবেন প্রায় ৬৪০ টাকা বেশি। যিনি ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট ব্যবহার করেন—তিনি বাড়তি দিবেন প্রায় ৯০০ টাকা। আর যিনি ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহার করেন—প্রতি ইউনিটে তাকে দিতে হবে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা, যা আগের চেয়ে ২ টাকা ৭৪ পয়সা বেশি। এর সাথে আনুপাতিক হারে বাড়বে ভ্যাট ও ট্যাক্স।এর মধ্যে যারা দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক গ্রাহক—যারা মাসে মাত্র শূন্য থেকে পঞ্চাশ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, দরিদ্রতম এসব গ্রাহকদের বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। যা ইউনিটপ্রতি দাম হয়েছে ৫ টাকা ৩২ পয়সা। সে হিসেবে পঞ্চাশ ইউনিট ব্যবহারকারী একজন গ্রাহকের মাসিক বিল বাড়বে ৩৭ টাকা। অথচ এসব গ্রাহকদের বলা হয় ‘লাইফ লাইন’ গ্রাহক। সারাদেশে এই শ্রেণিতে আছেন এক কোটি আটাত্তর লাখের বেশি গ্রাহক। তাদের মধ্যে এক কোটি একষট্টি লাখই পল্লী বিদ্যুতের গ্রামীণ গ্রাহক।এছাড়া কৃষি, শিক্ষা, ধর্মীয় স্থান—সবখানে নেমে এসেছে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির আঘাত। কৃষি সেচে বিদ্যুতের দাম বাড়নো হয়েছে ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে ৬ টাকা ৪ পয়সায়, যার হার ১৫ শতাংশ। সেচের এই খরচ বাড়লে চাষের খরচ বাড়বে। চাষের খরচ বাড়লে বাড়বে চালের দাম। স্কুল, মসজিদ, মন্দির, হাসপাতালে বিদ্যুতের দামও বাড়ল প্রায় ২০ শতাংশ। যে হাসপাতাল দরিদ্র রোগীদের সেবা দেয়, তার বিদ্যুৎ বিল বাড়লে সেবার মান বা খরচে প্রভাব পড়বে।বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে দাম বাড়ল ১৮ শতাংশ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ। নির্মাণ খাতে ইউনিটপ্রতি দাম ১৫ টাকা ১৫ পয়সা থেকে লাফ দিয়ে হলো ১৯ টাকা ৯ পয়সা। বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং স্টেশনেও দাম বাড়ল ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ।ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদে গ্রাহকরা বিদ্যুতের দাম কেন বারবার বাড়ছে—এর মূল উত্তর লুকিয়ে আছে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ নামের এক বিষফোঁড়ায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও কেন্দ্রগুলোকে ‘অলস’ বসিয়ে রেখে ভাড়া দিতে হয়। ২০১১-১২ অর্থবছরে এই ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল পাঁচ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা পৌঁছে গেছে ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকায়। আগামী বছর হতে পারে ৫২ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।সূত্রমতে, ২০১১ সালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ২ টাকা ৩৫ পয়সা। এখন সেটি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৫ টাকা ৪৬ পয়সা। কারণ কী জানতে চাইলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাস্তব চাহিদার চেয়ে বহু বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছিল। দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা এখন ১৮ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।১১ হাজার মেগাওয়াটের উদ্বৃত্ত সক্ষমতা অলস বসে আছে। সেই অলস কেন্দ্রগুলোর ভাড়া দিতে হচ্ছে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা। যা পুরোটাই ভুতুড়ে ও লুটপাটের আঁখড়া। আর এই টাকা আসছে সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিল থেকে। সেই ধারাবাহিকতায় ফের বাড়লো বিদ্যুতের দাম। দাম বাড়ানোর পর সরকারের বিদ্যুৎ ভর্তুকি ৫৬ হাজার কোটি থেকে কমে দাঁড়াবে ৪১ হাজার কোটি টাকায়। সরকার বাড়তি রাজস্ব পাবে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা প্রতি বছর বাড়ছে। অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ না করলে এই ব্যয় কমবে না। আর যতদিন এই বোঝা থাকবে, ততদিন জনগণের কাঁধেই চাপানো হবে মাশুল।দেশের বিদ্যুৎ খাতের সংকটের শিকড় গভীরে। অতীতের ভুল সিদ্ধান্ত, অপরিকল্পিত কেন্দ্র নির্মাণ, ক্যাপাসিটি চার্জের অসুস্থ ব্যবস্থা—এই সমস্যাগুলো সমাধান না করে শুধু দাম বাড়িয়ে সমাধান আসবে না। কিন্তু সেই কঠিন সংস্কারের পথে না হেঁটে মানুষের ঘাড়ে পা ফেলে হাঁটা হলো। প্রতিশ্রুতিও রাখলো না বিএনপি সরকার বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ঘোষণা দিয়েছিলেন—আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে বাড়ানো হলো বিদ্যুতের দাম। দায়িত্ব নেওয়ার একশো দিনের মধ্যেই লাইনের গ্যাস ছাড়া সব ধরনের জ্বালানির দামও বেড়েছে কয়েক দফা। আর অজুহাত হিসেবে সামনে আনা হলো ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতাকে।এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সরকারের কোনো চাপ ছিল না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে সরকার ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব পেলেও কমিশন সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে প্রায় ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আসবে। তারপরও সরকারকে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, সব শ্রেণির মধ্যে লাইফ লাইন গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে কম হারে দাম বাড়ানো হয়েছে। সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর রেট অব রিটার্ন ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন বাড়লে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।
৪ মাস ৫ দিন আগে