মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাতের মধ্যে তেলের জাহাজ হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে একজন ক্যাপ্টেনের মাসিক বেতন পৌঁছেছে ১ লাখ মার্কিন ডলারে। প্রতিবার হরমুজ পাড়ি দিতে ‘ঝুঁকি বোনাস’ হিসেবে ক্যাপ্টেনের অ্যাকাউন্টে যোগ হচ্ছে আরও ৫০ হাজার ডলার।
অর্থাৎ, এক মাসে যদি একজন ক্যাপ্টেন একবারও ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পাড়ি দেন, তার মোট আয় দাঁড়াচ্ছে দেড় লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় পৌনে ২ কোটি টাকা! (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসেবে) মাসিক এই বেতন-ভাতা মেরিটাইম সেক্টরের নজিরবিহীন নতুন এক রেকর্ড।
স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ পাড়ি দেওয়া অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেনের মূল বেতন ছিল মাসে ১৫ হাজার ডলার, বাংলাদেশি টাকায় ১৮ লাখ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আয় হঠাৎ অকল্পনীয়ভাবে বেড়ে গেছে প্রায় ১০ গুণ। শুধু ক্যাপ্টেনই নন, জাহাজের সাধারণ নাবিক, যাদের স্বাভাবিক বেতন মাসে দেড় হাজার ডলার, তারাও হরমুজ-ওমান উপসাগর এলাকায় প্রবেশ করলে পাচ্ছেন ছয় গুণ পর্যন্ত বেশি।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বিশেষ করে জ্বালানি পণ্য বাণিজ্যের ২৫ শতাংশ পরিবহন হয় ১৯১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই প্রণালি দিয়ে। পাড়ি দিতে সময় লাগে ছয় ঘণ্টা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এত বেশি বেতন কেন, কীভাবে দিচ্ছে জাহাজ মালিক ও পরিচালনাকারীরা। এর মূল কারণ বিশ্ব জুড়ে তেলের চড়া দাম। আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের সংকটে সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাহিদার গ্রাফ এখন শীর্ষে।
নাবিকদের এই আকাশচুম্বী বেতন ও ঝুঁকিপূর্ণ ভাতার বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও পণ্যের দামের ওপর গিয়ে পড়ছে। যার খেসারত গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সাধারণ নাগরিকদের। জাহাজ মালিক ও পরিচালনাকারীরা এই বিপুল খরচ তুলে নিচ্ছেন ‘স্পট ফ্রেইট রেট’ বা জাহাজ ভাড়ার হার বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে।
হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়ে অস্বাভাবিক বাড়তি আয়ের সুযোগ নিচ্ছেন ফিলিপাইন, ভারত ও চীনের নাবিকরা। এ তালিকায় বাংলাদেশি কোনো নাবিকের নাম পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, কোনো নাবিক যদি স্বেচ্ছায় ঝুঁকি জেনেও হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে চান তাহলে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এই মরণফাঁদ পাড়ি দিতে নাবিককে বাধ্য করা হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করে দেখা দরকার।
হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়ে অস্বাভাবিক বাড়তি আয়ের সুযোগ নিচ্ছেন ফিলিপাইন, ভারত ও চীনের নাবিকরা। এ তালিকায় বাংলাদেশি কোনো নাবিকের নাম পাওয়া যায়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাত ও ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে নেমেছে ধস। এই রুটে জাহাজ চলাচল অনেকটা বিপজ্জনক ও মরণফাঁদ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরানের ত্রিমুখী হামলা শুরু হলে তেহরান এ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দেয়। অনুমতি ছাড়া চলাচলকারী জাহাজে হামলাও চালায়। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরে বসায় নৌ-অবরোধ। এই পাল্টাপাল্টির মধ্যে গত সপ্তাহে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা পৌঁছেছে সর্বোচ্চে পর্যায়ে।
ওয়াইন্ড ওয়ার্ডের তথ্যে গত ১০ দিনে উপসাগরে হয়েছে ১৬টি হামলা। এই ঝুঁকি নিয়েই জাহাজ চালাতে বিশ্বের প্রভাবশালী তেল বিক্রয়, সরবরাহকারী দেশেগুলো যেকোনো মূল্যে সীমিত পরিসরে হলেও জাহাজ চলাচল সচল রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। সেপ্টেম্বরে ইরান-আমেরিকা শান্তি আলোচনার সুযোগে প্রচুর জাহাজ হরমুজ পাড়ি দিয়েছে ঝুঁকি নিয়ে। এমন প্রেক্ষাপটে ক্যাপ্টেনদের রেকর্ড বেতন ও ঝুঁকি ভাতা দিল গ্রিস, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক শিপিং লাইনগুলো।
হরমুজ পাড়ি দিতে এই বিপুল বেতন-বোনাস কীভাবে দিচ্ছে শিপিং লাইনগুলো। জবাব মিলল ক্যাপ্টেন হাবিবুর রহমানের বক্তব্যে। তিনি বলেন, হরমুজ পাড়ির দৈনিক জাহাজ ভাড়া এখন প্রায় ১৩ লাখ ডলার, যা গত বছর ছিল ২০-৫০ হাজার ডলার। বিশাল ট্যাংকারে ৫০ হাজার ডলারের বোনাস ব্যারেলপ্রতি যোগ করে মাত্র কয়েক সেন্ট। ফলে বোনাস-ভাতা রেকর্ড ছুঁয়ে গেলেও শিপিং লাইন বা সরবরাহকারীর আর্থিক ক্ষতি নেই।
জীবন বাঁচানোর ঝুঁকি জেনেও এই বিশাল আর্থিক সুবিধা নেওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো নাবিকদের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় বৃদ্ধি এবং এককালীন বড় উপার্জনের সুযোগ। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নীতি অনুযায়ী নাবিকদের যুদ্ধক্ষেত্রে বা ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে যেতে বাধ্য করা যায় না। এরপরও বিশাল অঙ্কের বেতন-বোনাসের হাতছানি এড়াতে পারছেন না অনেকেই। যদিও বাস্তব চিত্র হচ্ছে, জাহাজ পরিচালনাকারীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে চাকরি হারানোর অদৃশ্য চাপও থেকে যায়।
রয়টার্স ও অন্যান্য সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার তথ্য বলছে, বর্ধিত বোনাস পেলেও ক্যাপ্টেনদের পার হতে হচ্ছে চরম আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। হরমুজে হামলার হাত থেকে বাঁচতে বর্তমানে বেশিরভাগ ট্যাঙ্কার রাতের আঁধারে নিজেদের ‘জিপিএস এআইএস’ সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে ওমান উপকূল ঘেঁষে পথ অতিক্রম করছে।