চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে চলে হাজারো নিষিদ্ধ যানবাহন। সড়কটির শাহ আমানত ব্রিজ ও কর্ণফুলী মইজ্জ্যারটেকে গেলে মিলে হাজারো অবৈধ লোকাল সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত যানবাহন। যাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে গিয়ে চরম বিপাকে কর্ণফুলী মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক বক্সের টিআই আবু সাঈদ বাকার।
কারণ অবৈধ এসব সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত যানবাহন দাপিয়ে চলার মুলে রয়েছে বিশেষ এক টোকেন। যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠা সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিক্সা সমিতির নেতারা। যাদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে রয়েছে কর্ণফুলী মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক বক্সে দায়িত্বরত সার্জনরা। এদের অন্যতম হচ্ছেন সার্জন ওবাইদুল, সার্জন মোহিত মিঠু ও সার্জন রিয়াজ।
যারা টোকেন বানিজ্য তদারকির জন্য রোহিঙ্গা খোরশেদ, রাসেল, ইউসুপ, ইউনুস, আনোয়ার, সাকিব ও মহিউদ্দিনসহ কয়েকজনকে দালাল হিসেবে পোষেন। একাধিক মামলার আসামি এসব অপরাধির সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেট টোকেনের বিনিময়ে সুনির্দিষ্ট অর্থের চুক্তিতে হাজার হাজার নিষিদ্ধ যানবাহনকে মহাসড়কে নির্বিঘ্নে চলাচলের ‘পাস’ দিচ্ছে। যেখান থেকে প্রতিমাসে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সিন্ডিকেট চক্র। আর এর চূড়ান্ত খেসারত দিচ্ছে যাত্রী সাধারণ।
বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করতে ১৯ জুলাই রবিবার সকাল থেকে শেষ দুপুর পর্যন্ত অনুসন্ধান চালান দৈনিক ঈশানের এই প্রতিবেদক। অনুসন্ধানে মইজ্জ্যারটেক মোড়ে গ্রাম গাড়ি হিসেবে খ্যাত বাঁশখালী থেকে আসা সিএনজি অটোরিকশা চালক মুজিবুর রহমানের সাথে কথা হয়।
এ সময় সিএনজি অটোরিকশার কাগজপত্র আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, না-সেল রিসিট ছাড়া কোন কাগজপত্র নেই। শুধু আমার নয়, গ্রাম গাড়ির কোনটার নেই। ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কি না জানতে চাইলে, সহজ উত্তর-নাই। তাহলে গাড়ি চালান কেমনে-প্রশ্ন করা হলে বলেন, ‘টোকেন’ নিয়ে গাড়ি চালায়। টোকেন নিতে কত টাকা দেন-জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিমাসে ৮০০ টাকা। এছাড়া প্রতি টিউবে সমিতি নেয় ২০ টাকা। একই কথা বলেছেন সিএনজি চালক মশিউর, জাবের, কাদেরসহ আরও কয়েকজনে।
তাদের অভিযোগ, টোকেন নিয়ে আগে শান্তিতে গাড়ি চালালেও এখন তা আর পারছি না, নানা উছিলায় গাড়ি ধরে নিয়ে গিয়ে হয় মামলা দিচ্ছে, না হয় প্রতি গাড়ি থেকে ৩-৪ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। আর এসব টাকা নাকি নতুন টিআইয়ের জন্য। নতুন টিআই (ট্রাফিক ইনেসপেক্টর) নাকি অনেক গরম এবং সৎ, অবৈধ গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা না দিলে সার্জনদের চাকরি থাকবে না।
একই কথা বলেছেন মইজ্জ্যারটেক সিএনজি অটোরিকশা চালক সমিতির সেক্রেটারি মো. সেলিম। তিনি বলেন, ট্রাফিক বক্সে আগের টিআই আরিফ স্যার যখন ছিলেন, তখন এমন পরিস্থিতি হয়নি। টোকেন নিয়ে ড্রাইভাররা শান্তিতে গাড়ি চালিয়েছেন। কিন্তু নতুন টিআই আবু সাঈদ বাকার স্যার আসার পর তিনি অবৈধ গাড়ি পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। আর এ সুযোগে গাড়ি ধরে সার্জন ওবাইদুল, সার্জন মোহিত মিঠু ও সার্জন রিয়াজ হাজার হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন।
কিন্তু জানতে পারলাম, সার্জনরা নতুন টিআই স্যারকে বেচে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিলেও তিনি তা জানেন না। তবে বিষয়টি স্যারকে আমরা জানিয়েছি। একই অভিযোগ করেন ব্যাটারিচালিত রিক্সা সমিতির নেতারাও। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভিন্নমত পোষণ করেন মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক বক্সে কর্মরত একাধিক সার্জেন্ট।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তারা বলেন, আমরা যখন মহাসড়কে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো অবৈধ সিএনজি বা ফিটনেসবিহীন গাড়ি ধরে মামলা দেওয়ার জন্য বক্সে নিয়ে আসি, তখন টিআই আবু সাঈদ বাকার স্যার আমাদের ওপর চড়াও হন। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালীদের ‘ফোনকল’ এসেছে বলে গাড়িগুলো ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। আমরা আইনি দায়িত্ব পালন করতে চাইলে উল্টো আমাদের তিরস্কার ও প্রশাসনিক হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে।
আর এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কর্ণফুলী মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক বক্সের টিআই আবু সাঈদ বাকার বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, পেকুয়া, মগনামা ও বদরখালীসহ স্থানীয়ভাবে প্রতিদিন আনুমানিক চার-পাঁচ হাজার অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মইজ্জ্যারটেক থেকে চলাচল করে।
সেই সাথে অন্তত আর ২ হাজার ব্যাটরিচালিত রিকশা রয়েছে। যেগুলোর বৈধ কোন কাগজপত্র নেই, নেই কোন রুট পারমিট। এগুলো পরিচালনার জন্য স্টেশনে-স্টেশনে, মোড়ে-মোড়ে নানা নামে বহু সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে। যেগুলোর সাথে রাজনৈতিক যোগসুত্র রয়েছে। ফলে সংগঠনের নেতারা ট্রাফিক প্রশাসনের উপর প্রভাব বিস্তার করে। যাদের সাথে আমাদের কিছু লোকজনও মিলে মিশে রয়েছে। রয়েছে চিহ্নিত দালাল চক্রও।
যারা বিগত সময়ে বিশেষ টোকেনের মাধ্যমে অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত গাড়ি চলাচলের সুযোগ করে নেয়। কিন্তু আমি এখানে আসার পর থেকে সেই টোকেন বন্ধ করে দিয়েছি। এখন অবৈধ গাড়ি জব্দ করে সেগুলো ডাম্পিংয়ে পাঠাচ্ছি। এখানে এখন কোন টোকেন নেই।
ট্রাফিক সার্জনদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার জানামতে এমন ঘটনা ঘটেনি। যদিও চালকদের কেউ কেউ বিষয়টি আমাকে বলেছেন। বিষয়টি ইতোমধ্যে আমার উর্ধ্বতন স্যারকে অবহিত করেছি। আশা করি এ সমস্যা দ্রুত সমাধান হবে।
আক্ষেপ করে টিআই আবু সাঈদ বাকার বলেন, এলাকা ভেদে এমনিতেই ট্রাফিক পুলিশ সদস্য কম। অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা আটক করতে গিয়ে এখানে অনেক ট্রাফিক বনস্টেবল ও সার্জন চালকদের হামলার শিকার হয়েছে। চালকদের সিন্ডিকেট এতই শক্তিশালী যে, স্বল্প জনবল নিয়ে তাদের মোকাবেলা করা কঠিন। সব মিলিয়ে তিনি চরম বেকায়দায় রয়েছেন বলে জানান।
তবে টিআই আবু সাঈদ বাকারের ভিন্ন তথ্য মিলেছে অনুসন্ধানে। খোদ চালকরা জানান, সাধারণ রুটে প্রতিমাসে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, গুরুত্বপূর্ণ ও দূরপাল্লার রুটে প্রতিমাসে ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকা দিয়ে চলছে হাজার হাজার অবৈধ গ্রামীণ সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা। ছোট একটা কাগজের টুকরোয় বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন দেয়। চালকরা এই টোকেন দেখালেই সসম্মানে গাড়ি ছেড়ে দেন ট্রাফিক পুলিশ বা সার্জনরা।
কোনো চালকের কাছে যদি এই টোকেন না থাকে মুহূর্তের মধ্যে তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেওয়া হয় কিংবা গাড়ি আটকে হয়রানি করা হয়। মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক বক্সের এই টোকেন বাণিজ্যের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এতটাই শক্তিশালী যে প্রশাসনিক রদবদলও এই সিন্ডিকেটের চাকা থামে না। এই চক্রের মাঠপর্যায়ের মূল মাস্টারমাইন্ড বা সমীকরণ পরিচালনাকারী হিসেবে কাজ করছেন রোহিঙ্গা খোরশেদ, রাসেল, ইউসুপ, ইউনুস, আনোয়ার, সাকিব ও মহিউদ্দিনসহ কয়েকজন দালাল। বলতে গেলে তারাই ট্রাফিক সার্জন।
এই সিন্ডিকেটের হাত শুধু লোকাল সিএনজিতেই সীমাবদ্ধ নেই। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন মাঝারি ও দূরপাল্লার যাত্রীবাহী পরিবহন থেকেও নিয়মিত মাসোহারা বা মাসিক চাঁদা আদায় করে তারা। সৈয়দ নামের এক ব্যক্তির মধ্যস্থতায় বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানি থেকে প্রতি মাসে ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত ট্রাফিক বক্সের নামে চাঁদা তোলা হয়।
এমনকি রুট পারমিট ও বৈধ কাগজপত্রের তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে পরিচালিত দূরপাল্লার ‘ঈগল পরিবহন’ থেকেও প্রতি মাসে ‘চা-খরচ’ বা ‘লাইন খরচ’ নাম দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই টোকেন বাণিজ্যের আড়ালে দক্ষিণ চট্টগ্রামে সক্রিয় থাকা শত শত চোরাই সিএনজি অটোরিকশাও মহাসড়কে অবাধে বুক ফুলিয়ে চলাচল করছে।
সিন্ডিকেটের টোকেন কেনা থাকলে সেই গাড়ির বৈধ কাগজপত্র আছে কি না, কিংবা সেটি চুরি হওয়া গাড়ি কি না, তা খতিয়ে দেখার কোনো প্রয়োজন মনে করে না দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ। এতে সড়ক নিরাপত্তা যেমন তলানিতে ঠেকেছে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
চালকদের অভিমত, প্রতি মাসে টোকেন বাবদ এবং রাস্তায় প্রতিনিয়ত যে টাকা দিতে হয়, সেই ঘাটতি পোষাতে তারা যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে বাধ্য হন। ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, পেকুয়া, মগনামা ও বদরখালীসহ বিভিন্ন এলাকার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ, যারা জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন এই রুটে যাতায়াত করেন, তারা চরম অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হচ্ছেন।
মইজ্জ্যারটেক স্টেশন ও আশপাশের সংযোগ সড়কগুলো ঘুরে দেখা যায়, মহাসড়কের পাশে ট্রাফিক বক্স ঘিরে অবৈধভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশার স্ট্যান্ড। মাঝেমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে আবার পরিস্থিতি আগের রূপ ধারণ করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, টোকেন বা চুক্তির টাকা সময়মতো পৌঁছে গেলেই আবার রাস্তা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপির ট্রাফিক বিভাগের উপ-কমিশনার (বন্দর) কবীর আহম্মেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মহাসড়কে কোনো ধরনের টোকেন বাণিজ্য বরদাশত করা হবে না। বর্তমানে টোকেন বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ এবং আমাদের টিম নিয়মিত অবৈধ গাড়ি জব্দ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও সিন্ডিকেটের কথা বলছেন তার সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
(বি: দ্র: সড়ক-মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল নিয়ে নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির বিষয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে দৈনিক ঈশান। প্রতিবেদন তৈরিতে সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগীতা করার জন্য পাঠকদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ রইল)