সাগরিকা বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামকে ঝুঁকিতে ফেলে আধুনিক এলপিজি টার্মিনাল ও বোতল প্ল্যান্ট বানাচ্ছে বাংলাদেশ পেট্টোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। যেখানে একসঙ্গে ৪০ হাজার টন এলপিজি রাখা হবে। এ প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ শুরু করছে বিপিসি।
সূত্র জানায়, প্রায় ৫০ একর জমিতে বিপিসি আধুনিক এলপিজি টার্মিনাল ও বোতল প্ল্যান্ট বানাতে চাইছে। যেখানে একসঙ্গে ৪০ হাজার টন এলপিজি রাখা হবে। আর এই টার্মনাল সাগরিকা বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে।
এই জমির বাম পাশ দিয়েই চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোডের সংযোগ ফ্লাইওভার। পশ্চিমে মাথার ওপর দিয়ে নির্মিত পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চার লেনের সড়ক। এই সড়কটি দেশের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ‘চট্টগ্রাম বন্দর’-এর পণ্য পরিবহনের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত।
আবার এই সড়ক দিয়েই কর্ণফুলী টানেল হয়ে নদীর দক্ষিণ পাড়ের যোগাযোগ। জমির ডান পাশে সবুজেঘেরা প্রকৃতি। আছে ধানিজমি-বিল। জমির আশপাশেই আছে হাজারো মানুষ, আছে জেলেদের বসতি। এমন জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে চোখ পড়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)। যদিও জমিটি এখন পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় রয়েছে।
যেখানে বিপিসি এলপিজি টার্মিনাল ও বোতল প্ল্যান্ট তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন সেই জমি পেতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ধরনা দিচ্ছে বিপিসি। জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের খবর জানাজানি হলে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমি এবং একেবারে সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় থাকায় লোভ সামলাতে না পেরেই এ জমির ওপর নজর পড়েছে বিপিসির। স্থানীয়রা এ বিষয়ে জ্বালানি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ সাবেত আলীর নেতৃত্বে একটি তদন্ত দল সেই জমি পরিদর্শনে যান ৫ সেপ্টম্বর শনিবার দুপুরে। দলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, বিপিসি, চট্টগ্রাম বন্দর, পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চুয়েট, ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শন শেষে কমিটিপ্রধান সাবেত আলী জানালেন, ‘অভিযোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনেছি। অভিযোগগুলো আমরা ফিজিবিলিটি স্টাডিতে আমলে নিতে বলব। ইন্টারন্যাশনাল স্টান্ডার্ড অনুযায়ী সেইফটি এবং বাফার জোনের দূরত্ব ঠিক আছে কি না সেগুলোই স্টাডিতে উঠে আসবে। অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে মডেলিং হবে। এরপরই বাস্তবায়নের পালা। এখন কমিটি দ্রুত সময়ে রিপোর্ট দিবে। এরপরই মন্ত্রণালয় পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিবে।’
এলাকাবাসী জসিম উদ্দিন জিয়ার দাবি—প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ সেফটি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট, ফায়ার অ্যান্ড এক্সপ্লোশন রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট এবং এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, সিডিএ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত গণশুনানির আয়োজন করা। এলাকাটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রমাণিত হলে প্ল্যান্টটি অবশ্যই সরিয়ে নিতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা আহমেদ নবীর ভাষ্য, এলপিজি একটি অতি-দাহ্য ও চাপযুক্ত গ্যাস হওয়ায় যেকোনো যান্ত্রিক ত্রুটি, লিকেজ বা ছোট দুর্ঘটনা থেকে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে পারে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ঠিক কাছেই অবস্থিত সাগরিকা স্টেডিয়াম, যা একটি প্রধান আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ভেন্যু এবং খেলার সময় যেখানে দেশি-বিদেশি খেলোয়াড় ও হাজার হাজার দর্শকের সমাগম ঘটে। এমন একটি ঘনবসতিপূর্ণ ও সংবেদনশীল এলাকায় এলপিজির বিশাল মজুদ স্থাপন যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় অপূরণীয় মানবসম্পদ ও জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করবে।
স্থানীয় আরেক অধিবাসী আবু রায়হান আরও বড় ঝুঁকির কথাই জানান। তার শঙ্কা, প্রকল্পের গা ঘেঁষে থাকা চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড। এই রিং রোডটি চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য পরিবহন ও নগরের অন্যতম প্রধান সংযোগ সড়ক। যদি কখনো কোনো দুর্ঘটনায় এই টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তবে পুরো রিং রোডের যোগাযোগব্যবস্থা স্তব্ধ হবে। যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বন্দরমুখী মূল সরবরাহ সাইকেলের ওপর এবং জরুরি ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
প্রসঙ্গত, ২০২২ সালেও দক্ষিণ কাট্টলির এই জমিতে তখনকার সিটি মেয়র আজম নাছির উদ্দিন ও সাবেক সিটি মেয়র এম মনজুর আলমের যৌথ উদ্যোগে ‘শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম’ তৈরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। হোসনে আরা মনজুর ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে নির্মিত হওয়ার কথা ছিল এই স্টেডিয়াম।
সেসময়ে পুরো জমির মূল্য ছিল আনুমানিক ৫০০ কোটি টাকা। রাসেল মিনি স্টেডিয়ামের পাশে শেখ হাসিনার নামেও ‘সবুজ পার্ক’ নির্মাণের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তারা। এই স্টেডিয়ামের পাশের খালি জায়গায় মোস্তফা হাকিম গ্রুপ একটি কাভার্ডভ্যান ও স্কেভেটর ইয়ার্ড বানিয়েছিল। স্টেডিয়ামের অপর পাশে প্রায় পৌনে তিন একর জায়গা ভরাট করে তারা চীনের একটি প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দিয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেই পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে যায়।
জেলা প্রশাসনের সহায়তায় এই জমি উদ্ধার করে বুঝিয়ে দেওয়া হয় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে। এরপর চারিদিকে দেয়াল নির্মাণ করে নিজেদের জিম্মায় নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। এখন উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য সেই জমিতে ব্লক বানানোর কাজে ব্যবহার করছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর। এই ব্যবহার চলাকালীন বিপিসি এলপিজি টার্মিনাল ও বোতল প্ল্যান্ট তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন সেই জমি পেতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ধরনা দিচ্ছে বিপিসি।