দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় আসামি হয়ে দায়িত্ব থেকে পলায়ন এর অভিযোগে পেলেন বিভাগীয় শাস্তি। এরপর পারিবারিক কারণ দেখিয়ে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা চেয়ে করেছেন আবেদনও। সবকিছু ঠেলে বাংলাদেশ রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরেছেন প্রকৌশলী মো. তাকি আল যাওয়াদ।
তাকে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে বিভাগীয় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী হিসেবে ফের পদায়ন করা হয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালে তাকি আল যাওয়াদ বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রেলের চায়না এসি কোচের জন্য কন্ডেন্সার মোটর কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগে দুদকের দায়ের করা দূর্নীতির মামলার আসামি হন।
দুদকের তদন্ত নথিতে বলা হয়, বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অধীনে ‘সাপ্লাই অব থ্রি পেইজ ৪০০ ভোল্ট কনডেন্সার মোটর ফর চায়না এসি কোচেচ' প্রকল্পে ৪৪ লাখ ৮ হাজার টাকা ব্যয়ে মালামাল কেনার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার পর প্রয়োজনীয় মালামাল যথাযথভাবে সরবরাহ না করেই বিল পরিশোধ করা হয়। এ ঘটনায় সরকারি অর্থ আত্নসাতের অভিযোগে তাকি আল যাওয়াদসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দেয় দুদক।
দুদকের তদন্তে দরপত্র মূল্যায়ন, পণ্য সরবরাহ এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রেও অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করা হয়। সরবরাহকারীর ইনভয়েস, বিল অব লেডিং, ওয়ারেন্টি সার্টিফিকেট, ইন্সপেকশন সার্টিফিকেট ও সার্টিফিকেট অব অরিজিনসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়েও প্রশ্ন তোলে তদন্ত সংস্থা।
পরে এ ঘটনায় তাকি আল যাওয়াদসহ রেলের কর্মকর্তা ও অর্নব ইন্টারন্যাশনাল নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক চৌধুরী শরাফত করিমের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলায় দন্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
দুদকের মামলার পর তাকি আল যাওয়াদের বিরুদ্ধে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে বিদেশ যাওয়ার অভিযোগে পৃথক বিভাগীয় মামলাও হয়। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের চলতি বছরের ২১ জুন প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে দায়িত্ব থেকে 'পলায়ন' এর অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবানবন্দি, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য এবং মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করা হয়। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে আনীত 'পলায়ন' এবং 'পলায়নের দায়ে দোষী' হওয়ার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে মত দেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তাকি আল যাওয়াদের দুই বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের লঘুদন্ড দেওয়া হয়। ওই সময়ে তিনি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ও বেতন-সংক্রান্ত কোনো আর্থিক সুবিধার জন্য বিবেচিত হবেন না বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে দুদকের দায়ের করা মামলার মুখে প্রকৌশলী তাকি আল যাওয়াদ চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা চেয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদন করেন। আবেদনে তিনি পারিবারিক কারণ দেখিয়ে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
আবেদনে তাকি আল যাওয়াদ উল্লেখ করেন, ৩০ অক্টোবর ২০১৬ইং তারিখে ৩২তম বিসিএসের রেলওয়ে প্রকৌশল ক্যাডারে 'সহকারী বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী' হিসেবে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন এবং পরবর্তী সময়ে চাকরিতে স্থায়ী হন। একান্ত পারিবারিক কারণে তিনি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিতে ইচ্ছুক।
এ জন্য ১ অক্টোবর ২০২৩ থেকে তার ইস্তফা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রার্থনা করেন। নথিতে তাকি আল যাওয়াদের স্বাক্ষরও রয়েছে। তিনি তখন বাংলাদেশ রেলওয়ের লালমনিরহাটের বিভাগীয় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন বলে উল্লেখ করেন।
এতকিছুর পরও রেলওয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয় চলতি বছরের গত ৩ আগস্ট বদলি ও পদায়ন আদেশে তাকি আল যাওয়াদকে লালমনিরহাটের সাবেক বিভাগীয় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী থেকে বিভাগীয় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম পদে বদলি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাকি আল যাওয়াদ বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে সেগুলো মিথ্যা। আমি কখনো চাকুরি থেকে ইস্তফা দেইনি। আমার বিরুদ্ধে একটি পক্ষ ইচ্ছে করে এসব অভিযোগ উপস্থাপন করছেন। আমি দেশের বাইরে থাকার কারণে একটি বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। সেটির তদন্তও শেষ হয়েছে। দুদকের দায়ের করা মামলায় যে আর্থিক অভিযোগ আনা হয়েছিল সেটিও শেষ হচ্ছে।
চাকুরি থেকে ইস্তফা চেয়ে আবেদন দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও দেখা যায়, তৎকালীন লালমনিরহাট বিভাগীয় ব্যবস্থাপক আব্দুস সালাম তাকি আল যাওয়াদের করা আবেদনে স্বাক্ষর করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য রেলওয়ে পশ্চিম অঞ্চলের বিভাগীয় প্রধান বৈদ্যুতিক প্রকৌশলীর কাছে প্রেরণ করেন।
বিষয়টি স্বীকারও করেছেন তৎকালীন লালমনিরহাটের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক ও বর্তমান বাংলাদেশ রেলওয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক (প্রকৌশল) মো. আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, বিষয়টি ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসের দিকের। আমার যতটুকু মনে আছে-তাকি আল যাওয়াদের ইস্তফার একটা আবেদন আমি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করেছি।
এ অবস্থায় প্রকৌশলী তাকি আল যাওয়াদের চাকরিতে ফেরা নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে রেলজুড়ে। তার বিরুদ্ধে দুদকের দুর্নীতির মামলা চলমান, অন্যদিকে বিভাগীয় তদন্তে 'পলায়ন' এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে দুই বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের শাস্তি কার্যকর হয়েছে। চাকুরি থেকে ইস্তফা চেয়ে আবেদন করা এই প্রকৌশলী পরবর্তীতে কিভাবে আবার দায়িত্বে ফিরেছের এখন সেটাই আলোচনার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীন বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখছি। প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।