ভুমিদস্যু-সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য খ্যাত চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর অস্থায়ী ক্যা¤েপর পানির পাইপলাইন কেটে বিষ প্রয়োগ করেছে সন্ত্রাসীরা। আর এ পানি পান করে তিন সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
এ ঘটনায় সোমবার (২৭ জুলাই) সকালে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রক ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান ইয়াসিনসহ ৪৯ জনের বিরুদ্ধে সীতাকুন্ড থানায় মামলা করেছে আলীনগর অস্থায়ী যৌথবাহিনীর ক্যা¤েপর ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) মকবুল হোসেন। মামলায় ইয়াসিনসহ ৩৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
সীতাকুন্ড থানার ওসি মোহাম্মদ মহিনুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ট্যাংকে বিষ প্রয়োগে হত্যা প্রচেষ্ঠার অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনা তদন্ত করছে। এ ঘটনায় জড়িত একজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
ওসি মহিনুলের ভাষ্য, পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি নিয়ে পুলিশের জন্য সংরক্ষিত যে ট্যাংকে জমা রাখা হয়, শুধু সেটিতে বিষ জাতীয় কিছু প্রয়োগ করা হয়। পাইপলাইনটি কিছুটা কাটা অবস্থায় দেখা যায়। সেই কাটা অংশ দিয়ে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছে বলে তাদের ধারণা।
মামলায় যৌথবাহিনীর অভিযোগ, সন্ত্রাসীরা তাদের হত্যার উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত পানির পাইপলাইন কেটে বিষ প্রয়োগ করেছে। ফলে ট্যাংকের সব পানি বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। ট্যাংকের পানি পানের পর ক্যাম্পের তিন জন সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
সদস্যরা হলেন, মাঈন উদ্দিন ভ‚ঁইয়া, ইয়াসির আরাফাত ও সাজ্জাদ হোসেন। তারা আলীনগর ক্যা¤েপ কনস্টেবল পদে দায়িত্বরত আছেন। অসুস্থ হওয়ার পর তিনজনকে চট্টগ্রাম মডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অসুস্থ হওয়া সদস্যরা জানায়, রবিবার সকালে পানি পান করার সময় তারা পানিতে এক ধরনের দুর্গন্ধ পেয়েছিলেন। ক্যা¤েপর পানীয় জলের সরবরাহ পার্শ্ববর্তী একটি বাড়ি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে করা হয়।
খবর পেয়ে রবিবার দিনগত রাত সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, যে ঘরটির ভেতর ডিপ মোটর বসানো রয়েছে, সেখানে সরাসরি প্রবেশ করতে না পেরে দুর্বৃত্তরা পাইপলাইন ও সংযোগস্থলের গোড়া থেকে কেটে সেখানে সরাসরি রাসায়নিক কীটনাশক ঢেলে দেয়। ক্যা¤েপর পাশাপাশি স্থানীয় স্কুলের কোমলমতি শিশুরাও এই পাইপলাইনের পানি পান করতো। ফলে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারতো বলে গভীর আশঙ্কা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম বলেন, যৌথ বাহিনীর ক্যা¤েপর পানির ট্যাংকে বিষ প্রয়োগের জড়িতদের ধরতে অভিযান শুরু হয়েছে। যৌথ বাহিনীর ওই ক্যা¤েপ র্যাব, বিজিবি ও পুলিশ মিলিয়ে প্রায় তিনশ সদস্য রয়েছেন। পাশের ডিপটিউবওয়েল থেকে তাদের পানি সরবরাহ করা হয়। দুর্বৃত্তরা ডিপটিউবওয়েলের সংযোগস্থলে বিষ বা বিষজাতীয় কিছু পুশ করে। অপারেটর সকালে পানি ও ট্যাংক চেক করতে গিয়ে দুর্গন্ধ পেয়ে সবাইকে সতর্ক করেন। এর মধ্যেই হাত-মুখ ধোয়ার পর তিন জন সদস্য অসুস্থ হয়ে যান।
তিনি আরও বলেন, রাস্তা কেটে দেওয়া বা ক্যা¤প গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো এসব ঘটনা পুরোপুরি অন্তর্ঘাতমূলক কার্যক্রম। দেশের ও সরকারের বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে ¯েপশাল পাওয়ার অ্যাক্টে নিয়মিত মামলা করা হচ্ছে। বিকাল থেকে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে আলীনগরকেন্দ্রিক চিহ্নিত অপরাধীরাই এ ঘটনায় জড়িত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
উল্লেখ্য, প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমি দখল করে প্লট বানিয়ে বিক্রি করে জঙ্গল সলিমপুরকে রীতিমতো রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে চিহ্নিত ভ‚মিদস্যু ও সন্ত্রাসী চক্র। পুরো এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করেন চিহ্নিত ভ‚মিদস্যু ও সন্ত্রাসী ইয়াসিন। সেখানে লাখো মানুষের বসবাস। দুর্গম এলাকায় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে বারবার প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
পরে জঙ্গল সলিমপুরের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথবাহিনীর একটি অস্থায়ী ক্যা¤প স্থাপন করা হয়। গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের যৌথ অভিযানে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়েও এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি তারা; বরং অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
গত ২৫ মে জঙ্গল সলিমপুরে আলীনগর এলাকায় অবস্থিত যৌথ বাহিনীর ক্যা¤েপ গুলি বর্ষণসহ হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় ভেকু দিয়ে একটি নির্মাণাধীন ক্যা¤প ভেঙে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ২৪২ জনের নাম উল্লেখসহ ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করে সীতাকুন্ড থানায় মামলা করা হয়। তবে এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন মামলার প্রধান আসামি ইয়াছিন বাহিনীর প্রধান ইয়াছিন। এরপর গত ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে যান।