স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দিয়ে শুরু হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মহাযজ্ঞ।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, বর্ষা শেষে আগস্টের দিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে অন্য সব নির্বাচন আয়োজন হবে।
শুক্রবার (৬ জুন) বিষয়টি নিশ্চিত করেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদ। তিনি বলেন, ৮০ ভাগ নিশ্চিত যে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আগে হবে। আবার পৌরসভা ও ইউনিয়ন দুটো একসঙ্গেও আমরা করতে পারি।
নির্বাচন কমিশনার বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন না করলে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন করা যাবে না। কারণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা এক্স অফিসিও মেম্বার অব উপজেলা পরিষদ। এই কারণে নিয়ম অনুযায়ী আগে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। এটাই বাস্তবতা।
এরপর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করা যাবে। কিন্তু জেলা পরিষদের নির্বাচন একবারেই করা যাবে না। এটা হবে সবার শেষে।
তফসিল ঘোষণা কবে করা হবে জানতে চাইলে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘অক্টোবর তো ভোট হয়েই যাবে। আর তফসিল ঘোষণা হতে পারে আগস্টে।’
কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের কর্মী বা নেতা কর্মীদের নির্বাচনের বাইর রাখতে কোনো অঙ্গীকারনামার বিধান নতুন করে যুক্ত হচ্ছে কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে প্রার্থীদের হলফনামায় আলাদা কোনো অঙ্গীকারনামা থাকবে না। হলফনামায় ফরমের সঙ্গে একটা ঘোষণাপত্র থাকবে। প্রার্থী আচরণবিধি মেনে চলবেন-ঘোষণাপত্রে এমন একটি লাইন যুক্ত হবে।
সূত্রমতে, গত মঙ্গলবার ও বুধবার ইসির আইন ও বিধি সংশোধন সংস্কার কমিটির দুটি বৈঠক হয়। এসব বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর আচরণবিধিতে পরিবর্তন আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠক সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত সংশোধনের মধ্যে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বৃদ্ধি, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহের বিধান বাতিলসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন রয়েছে। সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা আচরণ বিধিমালার পরিবর্তে একটি অভিন্ন আচরণ বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে।
এছাড়া অনলাইনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার যে বিধান রয়েছে, তাও তুলে দেওয়া হবে। পাশাপাশি যেহেতু নির্দলীয় নির্বাচন হবে সেজন্য ভোটার সমর্থন হিসেবে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে প্রার্থীর জামানত ও নির্বাচনি ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধ, বিলবোর্ডে প্রচার, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারসহ নানা বিষয়ে বিধিনিষেধ যুক্ত করা হবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আচরণবিধির সঙ্গে সমন্বয় রেখে স্থানীয় সরকারের আইন-বিধান সংস্কার করা হবে।
আচরণবিধিতে কী কী সংশোধন আনা হচ্ছে- জানতে চাইলে এ কমিটির প্রধান ও নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, প্রার্থীদের জামানত জমা দেওয়ার সীমা বাড়বে, অনলাইনে মনোনয়ন জমা দেওয়া যাবে না, স্বতন্ত্র প্রার্থীর ১ শতাংশ সমর্থনের বিধান থাকছে না, পোস্টার থাকছে না, ইভিএমের ব্যবহার থাকছে না, পোস্টাল ব্যালটে ভোটদান থাকছে না।
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে চার হাজার ৫৮১টি। এর মধ্যে চলতি বছরেই নির্বাচন উপযোগী হবে তিন হাজার ৭৫৫টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং আগামী বছরে উপযোগী হবে আরও ৩৪৯টি। ৪৭৭টি আইনি জটিলতা, মেয়াদপূর্ণ না হওয়াসহ নানা কারণে অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভেঙে দেওয়া ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা, ১২টি সিটি করপোরেশন ও ৬১টি জেলা পরিষদ বর্তমানে নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে।
নতুন করে বগুড়াকে সিটি করপোরেশন ঘোষণার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। সে হিসাবে দেশে মোট সিটি করপোরেশনের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৩টি। পাশাপাশি নতুন পাঁচটি উপজেলা অনুমোদন করায় দেশের উপজেলার সংখ্যা হবে ৫০০।
নতুন উপজেলাগুলো হলো— বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা ভাগ করে ‘মোকামতলা’, কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা ভাগ করে ‘মাতামুহুরী’, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা ভাগ করে ‘রুহিয়া’ ও ‘ভুল্লী’ এবং লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা ভাগ করে ‘চন্দ্রগঞ্জ’ উপজেলা।
ইসি নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠান নির্বাচন উপযোগী হলেও নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি অনেকাংশে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। সরকার চাইলে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন আয়োজন করবে।
এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নির্বাচন আয়োজনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ইসিতে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ছাড়া নতুন করে আরও ১১টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। অন্যদিকে বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার প্রক্রিয়াও চলছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে ৬১টি জেলা পরিষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে বিএনপি সরকার গঠনের পর ধাপে ধাপে ৫৬টি জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।
বর্তমানে পৌরসভাগুলোও প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। শুধু ইউনিয়ন পরিষদগুলোতেই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করছেন।