চট্টগ্রামে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় আলোচিত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্যদিকে অভিযান টের পেয়ে পালিয়েছে সন্ত্রাসী মো. রায়হান আলম।
চট্টগ্রামের কুখ্যাত সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড ডেভিড ইমন ও রায়হানকে গ্রেপ্তারে বুধবার (২৯ জুলাই) ভোর রাতে যশোর ও নোয়াখালীতে যৌথ অভিযান চালায় পুলিশ। এর মধ্যে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর সকাল ১০টার দিকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম। তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের কুখ্যাত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে যশোর সদরের ঝিকরগাছা ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। তাকে ধরতে যশোর ও চট্টগ্রাম পুলিশের একাধিক টিম অভিযানে অংশ নিয়েছেন।
অন্যদিকে নোয়াখালীতে পুলিশের একাধিক টিম রায়হানকে গ্রেপ্তারে অভিযান করেছে। অল্পের জন্য রায়হান পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। তাকেও গ্রেপ্তার করা হবে। ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আগামীকাল বৃহ¯পতিবার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হবে বলে জানান এসপি।
পুলিশ জানায়, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকান্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুজন। তাদের একজন ডেভিড ইমন। এর আগে দেশে এই দলের নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি বর্তমানে কারাগারে থাকায় মোবারক হোসেন ও মোহাম্মদ রায়হান দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন।
পুলিশ আরও জানায়, চট্টগ্রামে গত কয়েক বছর ধরে বেশ কিছু চাঁদাবাজি ও হুমকির ঘটনায় আলোচনায় আসে ডেভিড ইমনের নাম। ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম মো. মুসা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ মোট সাতটি মামলার আসামি ডেভিড ইমন। রায়হানের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত আটটি মামলা রয়েছে।
এর আগে চট্টগ্রামে বিদেশি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলিসহ পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রবিবার রাতে নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন মো. আসিফ (২৫) ও সাইদুল ইসলাম ওরফে আরিফ (২৪)। এর মধ্যে আসিফ একটি মামলার পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি।
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, রবিবার রাতে আসিফকে ধরতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় তার (আসিফ) কোমর থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিনে থাকা দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। আরিফের প্যান্টের পকেট থেকে আরও দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
তিনি আরও জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার দুজন নিজেদের আলোচিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের সহযোগী বলে স্বীকার করেছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার কথাও জানিয়েছে তারা। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডেভিড ইমন ও রায়হানকে গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করা হয় বলে জানান সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ।
তিনি জানান, চট্টগ্রাম মহানগরীর চকবাজার এলাকার ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) নামক একটি ইন্টারনেট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে ডেভিড ইমন।
চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় সোমবার (১৩ জুলাই) ২০-২৫ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল প্রকাশ্য দিবালোকে ওই অফিসে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের নগদ ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।
এই ঘটনার ফোনের একটি অডিও কল রেকর্ড ও সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে ফোন করা ওই রেকর্ডে ইন্টারনেট ব্যবসায়ীকে বলতে শোনা যায়, আমাকে না চিনলে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেন, বড় সাজ্জাদ বাহিনীর ডেভিড ইমন ফোন করেছে বলেন, আমার ফোন নম্বর দেখান, তিনিই বলে দেবেন আমি কে। এই রেকর্ডে জন্ম দেয় নানা প্রশ্নের।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন মঙ্গলবার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ডেভিড ইমনের নিজ এলাকা ফটিকছড়ির কাঞ্চন নগরে তার খোঁজে মাঠে নামে জেলা পুলিশের বিশেষ টিম। কিন্তু তার নাগাল না পাওয়ায় অভিযান নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করেন নগর ও ফটিকছড়ির মানুষ।
তাদের অনেকেরই ভাষ্য ছিল, ডেভিড ইমন তাকে চট্টগ্রাম শহরে। আর পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে ফটিকছিড়িতে। যেন বগলের তলে রেখে ডেভিড ইমনকে খুঁজছে পুলিশ। অবশেষে ডেভিড ইমনকে যশোর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ সেই প্রশ্নে পানি ঢেলে দিয়েছে।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, চট্টগ্রামজুড়েই বড় সাজ্জাদ বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড ডেভিড ইমন ও রায়হান বাহিনীর নেটওয়ার্ক। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, আনোয়ারা ও হাটহাজারী উপজেলায় এই চক্রের প্রভাব বেশি। মূলত এসব এলাকায় বিচরণ ডেভিড ইমন ও রায়হানের। যেখানে তারা প্রতিনিয়ত নানা অপরাধ কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছেন।
ডেভিড ইমনের আগে ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন এই গ্রুপের নেতৃত্ব দিতেন। ছোট সাজ্জাদ বর্তমানে কারাগারে থাকায় ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান আলম নগরী ও জেলাকে ভাগ করে পৃথকভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে ডেভেলপার কো¤পানি, ইন্টারনেট, বালু তোলা, ডিশ ব্যবসা, গার্মেন্ট কিংবা খাতুনগঞ্জের আড়তদার সবার কাছে যেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক।