পুলিশের অভিযানের মুখে ভারতে পালানোর সময় একটি কালো প্রাইভেট কার থেকে আলোচিত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন এবং তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে নোয়াখালীর অভিযানে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় আরেক সন্ত্রাসী মো. রায়হান।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকালে চট্টগ্রাম মহানগরীর দুই নম্বর গেটস্থ চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম। তিনি জানান, ডেভিড ইমন ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে এমন তথ্য ছিল পুলিশের কাছে।
সেই তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর এলাকায় অবস্থান নেন। এ সময় সন্দেহ হলে সড়ক দিয়ে কালো রঙের একটি প্রাইভেটকারে তল্লাশি চালিয়ে ডেভিড ইমনকে শনাক্ত করে পুলিশ।
ইমনের আলোচিত গোফ কেটে ফেলায় পুলিশের চিনতে বেগ পেতে হয়েছে। পরে এক পর্যায়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেন সে চট্টগ্রাম মহানগরের আলোচিত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন। এ সময় গাড়ির ভেতরে থাকা তার তিন সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার অপর তিনজন হলেন, মো. শামীম, আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল এবং মো. সাফায়েত হোসেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ বৃহস্পতিবার সকালে তাদের আদালতে প্রেরণ করে।
ধামা ইলিয়াছের তথ্যেই মিলল ডেভিড ইমনের খোঁজ
চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে যুবলীগের নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে একে একে বেরিয়ে আসে শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যদের তথ্য। মামলায় গ্রেপ্তার মো. মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছকে দু‘দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যশোরে অভিযান চালায় চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা (ডিবি)।
ওই অভিযানেই আলোচিত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফটিকছড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজিসহ বেশ কয়েকটি অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম জানান, গত ১৩ জুন চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যাকান্ডের পর ঘটনার রহস্য উদঘাটনে তদন্ত শুরু করে জেলা পুলিশ। ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে হত্যাকান্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়।
এরপর গত ২২ জুলাই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মো. মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতের অনুমতি নিয়ে তাকে দু‘দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে ধামা ইলিয়াছ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অস্ত্রের মজুত এবং সহযোগীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ওই তথ্যের সূত্র ধরেই পরবর্তী অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়। পুলিশ জানতে পারে, চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালানো ডেভিড ইমনসহ কয়েকজন চট্টগ্রামের বাইরে যশোরে অবস্থান করছেন। তারা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, রিমান্ডে পাওয়া তথ্য ও গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতে গত ২৯ জুলাই যশোর জেলার কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকায় অভিযান চালানো হয়। যশোর জেলা পুলিশের সহযোগিতায় পরিচালিত ওই অভিযানে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পায় পুলিশ। ওই তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে ফটিকছড়ি থানার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর গ্রামের পাইট্রাল টিলাপাড়ায় অভিযান চালানো হয়। সেখানে মৃত আবুল হোসেনের একটি পরিত্যক্ত বসতবাড়ি থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি এবং অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে এই সন্ত্রাসী চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পালিয়ে গেলেও দোজখ দেখে ফেলেছে সন্ত্রাসী রায়হান
এদিকে ধামা ইলিয়াছের তথ্যে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড মো. রায়হানকে ধরতে নোয়াখালীর কো¤পানীগঞ্জে অভিযান চালায় পুলিশ। কিন্তু পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে রায়হান একটি বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যায়।
তবে পালিয়ে গেলেও দোজখ দেখে ফেলেছে সন্ত্রাসী রায়হান-সংবাদ সম্মেলনে এমন মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম। এসপি মাসুদ আলম বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানের অবস্থানের খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। প্রথমে দাউদকান্দিতে কুমিল্লা জেলা পুলিশের সহযোগিতায় এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকার চেকপোস্টে কড়াকড়ি আরোপের পরও সে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
পুলিশ সুপার উল্লেখ করেন, এ ধরনের অপারেশনগুলোর তথ্য অনেক সময় গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার কারণে পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও অপরাধ দমনে জেলা পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং সন্ত্রাসীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
এসপি বলেন, এ চক্রের সদস্যরা অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির। তারা প্রচলিত কোনো নেটওয়ার্ক বা সিম ব্যবহার না করে বিদেশি নম্বর এবং বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করত। দেশে আটকা পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে ডেভিড ইমন বড় সাজ্জাদের পরামর্শে ভারতে পালানোর পরিকল্পনা করে। এ তথ্য জানার পর পুলিশ তার ওপর কঠোর নজরদারি শুরু করে।
তিনি আরও বলেন, অপরাধীদের ধরা পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে বা বিষয়টি আলোচিত হয়ে পড়লে তারা বিদেশে থাকা গ্যাং লিডারদের শরণাপন্ন হয়। বিদেশে অবস্থানরত বড় সাজ্জাদের পরামর্শে অপরাধীরা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে এবং কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে এলাকায় অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করে। এসব ঘটনার সূত্র ধরে পুলিশ নিবিড় তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্লেষণ ও দীর্ঘ শ্রমের মাধ্যমে জেলা পুলিশের কয়েকটি টিম গঠন করে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন করে।
প্রসঙ্গত, ডেভিড ইমন দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগর, ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ ১৩টি মামলা রয়েছে। রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও চট্টগ্রাম মহানগরের কয়েকটি হত্যাকান্ডেও তাঁর স¤পৃক্ততার তথ্য তদন্তে পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে ধামা ইলিয়াছের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন থানায় ২১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি হত্যা মামলাসহ অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধের মামলা রয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার।