লন্ডনভিত্তিক শিপিংবিষয়ক সংবাদমাধ্যম লয়েডস লিস্টে ফের ৬৮-তে দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর। ২০২৫ সালের ৩৪ লাখ একক কনটেইনার ওঠা-নামার ভিত্তিতে ২০২৬ সালের আগস্টে এসে তালিকা প্রকাশ করল লয়েডস লিস্ট।
২০২৪ সালে ৩২ লাখ ৭৫ হাজার একক কনটেইনার ওঠা-নামা করেও ৬৮ অবস্থানে ছিল দেশের অর্থনীতির এই লাইফলাইন কর্ণফুলী নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম বন্দর।
শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে বিশ্বসেরা ১০০ বন্দরের তালিকা প্রকাশ করে লন্ডনভিত্তিক শিপিংবিষয়ক সংবাদমাধ্যম লয়েডস লিস্ট। সেখানে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান আগের বছরের মতোই ৬৮তম।
এ বিষয় জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরসচিব ও মুখপাত্র সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, আমরা লয়েডস লিস্ট রিপোর্ট এখনো পাইনি। তাই লয়েডস লিস্টে কেন এগোতে পারছে না দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এ নিয়ে কোন মন্তব্য করতে পারছি না।
তবে বন্দরের একাধিক কর্মকর্তার মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান এগোতে না পারার মূল কারণ প্রবৃদ্ধি কম থাকা। শীর্ষ তালিকার ১ থেকে ৬৭ তালিকার অধিকাংশ বন্দরই ৪ থেকে সাড়ে ১১ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। চট্টগ্রাম বন্দর করেছে চার শতাংশ। ফলে দেশের মধ্যে বেশি কনটেইনার ওঠা-নামা করলেও আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর বন্দরের তুলনায় চট্টগ্রাম পিছিয়ে।
সূত্র মতে, দক্ষিণ এশিয়ার বন্দরগুলোর মধ্যে ভারতের দুটি বন্দর শীর্ষ তালিকায় স্থান পেয়েছে। ভারতের মুন্দ্রাবন্দর ২৫তম ও জওহরলাল নেহরু বন্দর ৩০তম অবস্থানে রয়েছে। শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরের অবস্থান ২৯তম। মালয়েশিংয়ার পোর্ট ক্লাং দশম। পাকিস্তানের করাচি বন্দরের অবস্থান অবশ্য চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে ১৬ ধাপ পিছিয়ে ৮৪তম।
বিদেশি শিপিং লাইনে কর্মরত এক কর্মকর্তার ভাষ্য, শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দর এবং ভারতের মুন্দ্রাবন্দরের উত্থানের মূল শক্তি হলো ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা ও ড্রাফট। ভারতের বেসরকারি খাতের মুন্দ্রাবন্দর আধুনিক অটোমেশন, নিজস্ব রেল সংযোগ এবং দ্রুত টার্নঅ্যারাউন্ড টাইমের মাধ্যমে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে উঠেছে।
এর বিপরীতে চট্টগ্রাম বন্দর কোনো ট্রান্সশিপমেন্ট কার্গো পায় না; এটি কেবল বাংলাদেশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ তৈরি পোশাক রপ্তানি ও বাণিজ্যিক পণ্য আমদানির ভেতর সীমাবদ্ধ। গভীর ড্রাফট না থাকা এবং আন্তর্জাতিক ট্রানজিট কার্গো আকর্ষণ করতে না পারাই কলম্বো ও মুন্দ্রার চেয়ে চট্টগ্রামের পিছিয়ে থাকার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
লয়েডস লিস্টের শীর্ষ ১০০ কনটেইনার বন্দরের তালিকায় চীন বরাবরই একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখছে। বিশ্বের বৃহত্তম কনটেইনার বন্দর হিসেবে এবারও এক নম্বরে চীনের সাংহাই বন্দর। শীর্ষ দশটি বন্দরের মধ্যে সাতটি বন্দরই চীনের দখলে।
সেরা দশের তালিকায় রয়েছে যথাক্রমে দ্বিতীয় স্থানে পোর্ট অব সিঙ্গাপুর, তৃতীয় নিংবো-ঝৌশান (চীন), চতুর্থ শেনজেন (চীন), পঞ্চম কিংদাও (চীন), ষষ্ঠ গুয়াংজু (চীন), সপ্তম বুসান (দক্ষিণ কোরিয়া), অষ্টম তিয়ানজিন (চীন), নবম জেবেল আলী (দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত) এবং দশম স্থানে হংকং (চীন)।
শুধু তাই-ই নয়, ১০০ কনটেইনার বন্দরের তালিকায় চীনের মূল ভূখন্ডের ২৭টি বন্দর রয়েছে। এসব বন্দর সম্মিলিতভাবে বছরে ৩১ কোটি একক কনটেইনার ওঠা-নামা করেছে, যা তালিকার ১০০টি বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের (প্রায় ৭০ কোটি একক) প্রায় ৪৫ শতাংশ।
উল্লেখ্য, প্রতিবছর সর্বোচ্চ কনটেইনার ওঠা-নামার ভিত্তিতে সেরা ১০০ কনটেইনার বন্দরের তালিকা প্রকাশ করে আসছে তথ্য বিশ্লেষণকারী এই সাময়িকী। এখানে বন্দর সেবার মান, কাস্টমস প্রক্রিয়া, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা কিংবা জাহাজের অপেক্ষার সময় বিবেচনায় নেওয়া হয় না। এটি গুণগত বা দক্ষতাভিত্তিক সূচক নয়। একমাত্র মাপকাঠি হলো ভলিউম বা পরিমাণভিত্তিক। ফলে যে বন্দর দিয়ে যত বেশি কনটেইনার ওঠা-নামা হয়, তালিকায় তার অবস্থান এগিয়ে থাকে।