তরুণীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর এমপি গাজী নজরুল ইসলাম। এমন একাধিক ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অবশেষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালো দলটি।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাটির সার্বিক খোঁজখবর নিয়ে ও প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে দলীয় সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্বাক্ষরিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়, অতি সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত খবরের দিকে জামায়াতে ইসলামী গভীরভাবে নজর রাখছে।
বিবৃতিতে জামায়াত নেতা বলেন, ইতোমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে জনাব গাজী নজরুল ইসলামের নিজের বক্তব্য এবং তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীসহ দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার ভিডিও বক্তব্য মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে আরও খোঁজখবর নিয়ে এবং ঘটনার প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
প্রসঙ্গত, এক তরুণীর সঙ্গে জামায়াত এমপি নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের একাধিক ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে, যেগুলো সিসিটিভি ফুটেজ থেকে সংগৃহীত। সেখানে ওই তরুণীর সঙ্গে জামায়াত এমপিকে একটি কক্ষে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা গেছে।
ভিডিওগুলো ভাইরাল হওয়ার পর রাজনৈতিক মহলসহ বিভিন্ন অঙ্গণে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এ ঘটনায় নিজের মতো ব্যাখ্যা দিয়েছেন জামায়াত এমপি এবং ওই তরুণী। দুজনেরই দাবি, তারা বিয়ে করেছেন। কিন্তু তাতে থেমে নেই আলোচনা-সমালোচনা।
তাদের দাবিকৃত দ্বিতীয় বিয়ে নিয়েও নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বিয়ের তারিখের সঙ্গে একটি বায়োডাটায় উল্লিখিত বৈবাহিক অবস্থার অসঙ্গতি নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে ওই এমপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জামায়াতকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভিডিওতে একটি কক্ষে গাজী নজরুল ইসলাম ও এক তরুণীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানে একটি টেবিলের ওপর রাখা পরিচয়পত্রে ‘বাংলাদেশ পার্লামেন্ট’ এবং ‘১৩তম পার্লামেন্ট’ লেখা দেখা যায়। পরিচয়পত্রে গাজী নজরুল ইসলামের ছবি, নাম এবং সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচয়ও দৃশ্যমান।
ভিডিওতে হট্টগোলের মধ্যে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘দেখেন, সাতক্ষীরার জামায়াতের লোক মেয়েসহ এখানে ধরা খাইছে। এই যে, এই মুরুব্বি।’ তবে ভিডিওটি কবে, কোথায় এবং কী পরিস্থিতিতে ধারণ করা হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
এর আগে সোমবার রাত থেকে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এক তরুণীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি প্রকাশের পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
প্রথম দিকে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের নেতারা ভিডিওটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেন। পরে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ‘বেঙ্গল লেন্স’ ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে এটিকে এআই-নির্মিত নয় বলে দাবি করে।
পরবর্তী সময়ে গাজী নজরুল ইসলাম নিজেই ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, ভিডিওতে থাকা তরুণী মরিয়ম খাতুন তার দ্বিতীয় স্ত্রী। একই দাবি করেন সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের নেতারাও।
লিখিত বিবৃতিতে গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়। তিনি দাবি করেন, গত ১৩ জুলাই তিনি তার প্রথম স্ত্রী, দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মাছুম বিল্লাহকে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে শ্বশুরের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে যান। সেখানে অবস্থানকালে তার গাড়িচালক ও দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করেন।
তার অভিযোগ, তাদের জিম্মি করে এক লাখ টাকা আদায় করা হয় এবং পরে আরও কয়েক লাখ টাকা চাওয়া হয়। টাকা না দেওয়ায় ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পুরো ঘটনাকে তিনি পরিকল্পিত ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চরিত্রহননের ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন।
এরই মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি বায়োডাটা, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন, ১৭ জুন মরিয়ম খাতুনকে তিনি বিয়ে করেন। কিন্তু গণমাধ্যমের হাতে আসা একটি বায়োডাটায় দেখা যায়, ২২ জুন তারিখে—অর্থাৎ দাবিকৃত বিয়ের পাঁচ দিন পরও—মরিয়ম খাতুনের বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ রয়েছে।
ওই বায়োডাটায় গাজী নজরুল ইসলামের স্বাক্ষরও রয়েছে। স্বাক্ষরের ওপরে সবুজ কালিতে হাতে লেখা রয়েছে- ‘জোর সুপারিশ করছি’। এ কারণে বিয়ের সময়কাল ও নথিপত্রের তথ্য নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে গণমাধ্যমের হাতে আসা একটি কাবিননামার কপিতে দেখা যায়, তিন লাখ টাকা দেনমোহরে গাজী নজরুল ইসলাম ও মরিয়ম খাতুনের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। কাবিননামায় সাক্ষী হিসেবে মো. আবুল হোসেন এবং বেগম মাকসুদা ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
ভিডিও প্রকাশের পর গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এক ভিডিও বার্তায় বলেন, মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে তার স্বামীর পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয়েছে এবং তিনি নিজেও বিষয়টি জানতেন। এ নিয়ে অপপ্রচার চালানো হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে মরিয়ম খাতুনও পৃথক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, গাজী নজরুল ইসলাম তার বৈধ স্বামী। সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া ভিডিওকে তিনি একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেন।
মরিয়মের বাবা মাছুম বিল্লাহও দাবি করেন, গত ১৭ জুন দুই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে বিয়ে সম্পন্ন হয় এবং অনুষ্ঠানে গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন।