প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভুল-ভাল কথা বলেন দাবি করে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন- প্রধানমন্ত্রীর পদটা রাষ্ট্রীয় পদ। তিনি রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী। তার দিকে তাকিয়ে বিশ্বের লোকজন বাংলাদেশকে হিসাব করবে। তার মুখ দিয়ে যদি অনবরত ভুল-বাল কথা বের হতে থাকে, তাহলে বাংলাদেশ লজ্জিত হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
জামায়াতের আমির আরও বলেছেন, চট্টগ্রামবাসী সর্ববিষয়ে বিশারদ একজন সর্বমন্ত্রী পেয়েছেন। সত্যি আপনারা এতই ভাগ্যবান যে, এক মন্ত্রী সব মন্ত্রণালয় চালায়-এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কথাও তাকে বলতে হয়।
শনিবার (১৩ জানুয়ারি) বিকেলে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে নেতাকর্মীরা এ সময় ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিলে জামায়াত আমির বলেন, নিজেদের সন্তানকে ভুয়া বলতে নেই। নিজের সন্তান কানা হলেও পদ্মলোচন।
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে আয়োজিত ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াত ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর জন্য সত্যিই আমার কষ্ট হয়। ওনি কুমিল্লায় এসে ইপিজেড দেন। ফরিদপুরে গিয়ে সয়াবিন তেল দেন। দিনাজপুরে গিয়ে আম উপহার দেন। সিলেটে গিয়ে সাড়ে নয় ঘণ্টা উপহার দেন। জাতীয় সংসদে গিয়ে প্রাথমিক বিশ্ববিদ্যালয় উপহার দেন। আর কক্সবাজারে এসে বলেন, বিরোধী দল বাজেটে মাদক ও ধূমপান জাতীয় দ্রব্যমূল্যের টেক্স বাড়ানো হয়েছে বলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে মিছিল করেছে। এগুলো সব মিথ্যা ও ভুয়া। বিরোধী দলের কেউ এটা করেনি।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ওদেরকে চিহ্নিত করুন যারা আপনাকে ভুল বুঝাচ্ছে। তারা আপনার সম্মান আর বাংলাদেশের সম্মান ধ্বংস করছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। নইলে ক্ষতিগ্রস্ত শুধু আপনি হবেন না, গোটা জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেন।
বাজেটে বিরোধী দল প্রতিক্রিয়া জানাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এতে রাগ করার কি আছে? অল্পতে ধৈর্য হারালে ১৮ কোটি মানুষের দায়িত্ব পালন করবেন কীভাবে? তবে হা জনগণ যখন দেখবেন, জনআকাঙ্খা বাস্তবায়নে আপনি এবং আপনার সরকার আন্তরিক, তখন আপনাদের প্রশংসা করবে। কিন্তু যখন জনগণ দেখবে আপনারা ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে অপমান অগ্রাহ্য করছেন, তখন জনগণ বসে বসে আঙুল চুষবে না।
সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমদ (বীর বিক্রম)। তিনি বলেন, দেশের জনগণ বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। চোর, ছিনতাইকারী, নারী-শিশু ধর্ষণকারী ও অন্যান্য অপরাধীদের দমনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই।
অলি আহমেদ বলেন, মানুষের মধ্যে সত্য, ন্যায়, পার¯পরিক সহযোগিতা ও দেশপ্রেমের চেতনা জাগ্রত করতে হবে। অন্যের সমালোচনার আগে নিজেদের সংশোধন এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে।
দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা উল্লেখ করে অলি আহমেদ বলেন, সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না। গ্রামাঞ্চলে সন্ধ্যার পর মানুষের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। নারীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতেও নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে এবং ব্যবসায়ীরাও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।
তিনি বলেন, ডাকাতদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হলেও চোর ও ছিনতাইকারীরা এখনও সক্রিয় রয়েছে। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। আওয়ামী ডাকাতরা কলকাতায় পালিয়ে গেছে। চোররা এখানে রয় গেছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সরকার প্রধানের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বা অন্য যেকোনো দায়িত্বেই থাকুন না কেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। নিজেকে একজন রাষ্ট্রনায়কের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার আহ্বানও জানান তিনি।
অলি আহমেদ বলেন, দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে যেকোনো অপচেষ্টা ও বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ¯পষ্ট। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সংলাপ ও সমঝোতার আহ্বান জানান এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানান। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ছাড়া এদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা হবে বলে মনে করি না। এ সময় ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেছেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভীত রচিত হয়েছিল ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরে। শাপলার শহীদদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও স্বীকৃতি দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি। যদি আপনারা সেটি করতে ব্যর্থ হন, তাহলে প্রমাণ হবে ইসলাম, মুসলমান ও মদিনার ইসলামের কথা বলা কেবল ধোঁকাবাজি ছাড়া আর কিছু নয়।
তিনি দেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও সমালোচনা করে বলেন, দুর্বল পররাষ্ট্রনীতির কারণে স্বাধীনতার সূর্য বাংলার আকাশ থেকে অস্তমিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সীমান্ত বন্ধ হচ্ছে। সীমান্তে হত্যাকানন্ডকে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। আমরা এ ধরনের বক্তব্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি। সীমান্তে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা দেখতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে মামুনুল হক বলেন, আপনাকে ব্যক্তি হিসেবে সম্মান জানাই। বিশেষ করে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান হিসেবে আপনার প্রতি বিশেষ সম্মান রয়েছে। তবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার শেখ হাসিনার রাজনীতি করবেন না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলা হলেও বাস্তবে সেই নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পার্লামেন্ট থেকে সচিবালয় সব জায়গায় হুতুমপেঁচা বসেছে। তারা সেখানে দুর্নীতি ও অনিয়মসহ নানা ধরনের অপকর্মে জড়িত। কিন্তু আমাদের দল চাঁদাবাজি বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নয় এবং তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ধৈর্য ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে।
ভারত সীমান্তে উত্তেজনা প্রসঙ্গে পাটওয়ারী বলেন, আমরা বাংলাদেশের সীমান্তে কোনো হত্যাকান্ড সমর্থন করি না। যেদিন সীমান্তে হত্যা বন্ধ হবে এবং বাংলাদেশের কোনো নাগরিককে অবৈধভাবে হত্যা করা হবে না, সেদিনই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রকৃত অর্থে ন্যায্য ও স্বাভাবিক স¤পর্ক প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।
প্রস্তাবিত বাজেটের সমালোচনা করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, এটি কোনো বাজেট নয়, বরং দলীয় লোকজনের জন্য তৈরি একটি গেজেট। এর মাধ্যমে দেশে চাঁদাবাজিকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। এই বাজেটে শহীদ আবু সাঈদ, ওয়াসিম কিংবা মুগ্ধের আত্নত্যাগের প্রতিফলন নেই। তাই এই বাজেটের প্রতি ধিক্কার জানাই।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ স¤পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলেন, গত ১৭ বছরে দিল্লির গোলামি আপনারা কম করেননি। আপনাদের মন্ত্রী-নেতারা অমিত শাহের পায়ে অর্ঘ্য দিয়ে এসেছেন, মাথানত করে সেজদা করে এসেছেন।
তারপরও দিল্লি আপনাদের বিশ্বাস করেনি। অতীত থেকে যদি শিক্ষা না নেন, তাহলে বুঝতে হবে আপনারা বদলাননি। ২০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর আমাদের ধারণা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির মন্ত্রীদের নিয়ে যে সরকার গঠিত হয়েছে, তারা তাদের অতীত ভোগান্তি থেকে শিক্ষা নেবেন বা নিয়েছেন।
কেন তারা এত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় আসতে পারেননি, কী কী কারণে গত ২০ বছর স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হারিয়ে দেশ প্রায় একটি ভ্যাসাল স্টেটে পরিণত হয়েছিল, এবং কী কারণে বাংলাদেশের জনগণ গত ১৭ বছর আপনাদের নেতৃত্বে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেনি এসব বিষয় তারা উপলব্ধি করেছেন বলে আমাদের ধারণা ছিল।
আমরা ধারণা করেছিলাম, আপনাদের ফোনের অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোনের আইওএস যেমন আপডেট হয়েছে, তেমনি আপনাদের চিন্তাভাবনাও আপডেট হয়েছে। কিন্তু আপনাদের মন্ত্রীদের বক্তব্য ও কর্মকান্ড দেখে মনে হচ্ছে, ২০০৬ সালে ক¤িপউটার বন্ধ করে গ্যারেজে রেখে গিয়েছিলেন; সেই ক¤িপউটারে এত বেশি ধুলাবালি জমেছে যে, এখন আর মুছেও সেটিকে সংশোধন করা যাচ্ছে না, বলেন ফুয়াদ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বদলে গেছে, কিন্তু আপনাদের স্বভাব বদলায়নি। আওয়ামী লীগেরও ১৭ বছরে লেজ সোজা হয়নি। আমরা জানি কীভাবে সেই লেজ সোজা করতে হয়। বাংলাদেশের মানুষকে গণতান্ত্রিক ও সংসদীয় রাজনীতির বাইরে যেতে বাধ্য করবেন না। এটি সরকারের জন্যও ভালো হবে না, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্যও কল্যাণকর হবে না।