নির্বাচনের আগে বিএনপির স্লোগান ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, কিন্তু নির্বাচনের পরে কর্মকাণ্ডে ‘সবার আগে বিএনপি’—এমন চিত্রই দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেছেন তিনি।
সম্প্রতি ছাত্রদলের তিন নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ গ্রেডে উপপরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাকে সামনে এনে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে দলীয়করণের অভিযোগ করেছে জামায়াত।
দলটির দাবি, সম্প্রতি ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সহসভাপতি আব্দুল্লাহ আল নোমানকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (বিডা) এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সহসভাপতি মেহেদী হাসান আবিরকে মহেশখালী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে ষষ্ঠ গ্রেডের উপপরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক রাকিবুল হাসান রাকিবকেও ষষ্ঠ গ্রেডের উপপরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপির ৩১ দফার নবম দফায় ‘সংকীর্ণ রাজনৈতিক দলীয়করণের ঊর্ধ্বে’ উঠে রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। কিন্তু সরকার গঠনের পাঁচ মাসের মধ্যেই বিএনপি বিভিন্ন সাংবিধানিক, সংবিধিবদ্ধ, স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়োগ দেওয়া শুরু করেছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন না দিয়ে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে অতিরিক্ত সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সামসুল আলমের নিয়োগের বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে বিশেষভাবে তুলে ধরেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।
তার দাবি, সামসুল আলম অতীতে বিএনপির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে গঠিত সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ-সংক্রান্ত একটি কমিটির সদস্য ছিলেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যার নিরপেক্ষতা ও জনআস্থা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একজনকে নিয়োগ দেওয়া হলে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
‘বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ৬৭ বছর বয়সী একজন ব্যক্তিকে পুনরায় এত স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না’,-বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামসুল আলমের নিয়োগ অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়ে জামায়াতের এই নেতা বলেছেন, এই নিয়োগ বহাল থাকলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এ অবস্থায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি বিরোধী দলগুলোকে পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার একটি তালিকাও তুলে ধরে জামায়াত।
দলটির দাবি, বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক রাশেদুল হককে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয়েছে। বিএনপির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক এটিএম আব্দুল বারী ড্যানিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের চেয়ারম্যান এবং রংপুর বিভাগীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেককে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিএনপির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সহসম্পাদক কাজী রওনকুল ইসলাম টিপুকে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ঢাকা বিভাগীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে।
বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক এবং রাজশাহীর সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির কার্যকরী সভাপতি সালাউদ্দিন সরকারকে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামান সুরুজকে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান, যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জাকির হোসেন সিদ্দিকীকে বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসানকে বাংলাদেশ পাট করপোরেশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
গোলাম পরওয়ার বলেছেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় নেতাদের বসানোর মাধ্যমে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যা অতীতে আওয়ামী লীগের আমলে দেখা দলীয়করণের পুনরাবৃত্তি। নাম পরিবর্তন হলেও, চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় পরিচয় নিয়োগের প্রধান যোগ্যতা হয়ে উঠছে।